সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তের বিস্তীর্ণ শুষ্ক অঞ্চলটিই হলো সাহেল। আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের সীমানাকে কেন্দ্র করে রয়েছে এলাকাটি। একদিকে উত্তরের মরুময় সাহারা এবং অন্যদিকে দক্ষিণের আর্দ্র ক্রান্তীয় অঞ্চলের মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে। সাহেল অঞ্চলে গাছপালার সংখ্যা খুবই কম। হালকা সাভানা তৃণভূমি ও ঝোপঝাড় দেখতে পাওয়া যায়।
বছরে মাত্র ৪ থেকে ৮ ইঞ্চি পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয় এই এলাকাটিতে। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ১৯৮০-র দশকের শুরুর দিকে দীর্ঘায়িত খরার কারণে, জনসংখ্যা ও পশুর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সাহেল অঞ্চলটি অতি দ্রুত মরু অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। সেখানকার মাটি ক্রমশ আর্দ্রতা হারাচ্ছে। খরা ও দুর্ভিক্ষ সেখানকার নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।
ভৌগলিক দিক দিয়ে সাহেল মূলত আটলান্টিক মহাসাগরের পাড় ঘেঁষে উত্তর সেনেগাল থেকে শুরু করে মাওরিতি, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, নাইজেরিয়া, চাঁদ এবং সুদান ও ইরিত্রিয়া, লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ। প্রচণ্ড খরার ক্ষীপ্রতার কারণেই সাহেলের বাসিন্দারা উন্নত জীবন ধারণের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছেন আশেপাশের বিভিন্ন শহরে। শুধু খরাই নয় রয়েছে আরো একটি বড় সমস্যা। ওই এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় নিজ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই। এরই মধ্যে গত এক বছরে সাত লাখেরও অধিক জনগণ পালিয়েছে দেশটি থেকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাহেলের পশ্চিমাঞ্চলটি সশস্ত্র সংঘাতের কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই সশস্ত্র সংঘাতে জড়িতরা মূলত স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সেনাবাহিনী। ২০১২ সাল থেকেই সাহেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সঙ্কটের মুখে পড়ে। যখন উত্তর মালির বিচ্ছন্নতাবাদী একটি দল উপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সের দ্বারা সামরিকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়।
ফ্রান্সের উদ্দেশ্য ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে রাজধানী বামক থেকে দূরে রাখা এবং মালি রাষ্ট্রকে স্বাভাবিক রাখা। তবে এই সংঘাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সেইসঙ্গে দারিদ্র, ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে কাজে লাগিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলো নিজেদের পরিসর বাড়াচ্ছে।
বহুমুখী হুমকি
এই অঞ্চলে কয়েকটি সশস্ত্র দল সক্রিয় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ের প্রাণঘাতী হামলার জন্য দায়ী মূলত আল-কায়দার মদদদাতা জামাত নাছর আল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন এবং আইএসআইএল। যা ইসলামিক স্টেট ইন দ্য গ্রেটার সাহারা হিসেবে পরিচিত। অত্র অঞ্চলে বৃহৎ পরিসরে কার্যক্রম চালানো দলগুলোর মধ্যে আন্যতম হলো আল মুরাবিতুন, আনসারুল ইসলাম, প্লাটফর্ম, আনসার আল-দিন এবং বোকো হারাম।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত বুরকিনা ফাসো, মালি এবং নাইজারে পাঁচগুণ হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বাধিক ভুক্তভোগী তিনটি দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এরই মধ্যে চার হাজারেরও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, বেসামরিক জনগণের উপর হামলা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত এক বছরে সাত লাখেরও অধিক জনগণ বুরকিনা ফাসো থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। মালি ও নাইজেরিয়া থেকেও হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং সেখানকার স্কুলগুলোও বন্ধ রয়েছে।
বিদেশি বাহিনী মোতায়েন
২০১৭ সাল থেকে একটি সাহায্যকারী বাহিনী অত্র অঞ্চলের সংঘাত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। বহুজাতিক এই বাহিনীর নাম দেয়া হয়েছে জি-৫। এটি মূলত বুরকিনা ফাসো, চাঁদ, মালি, মারুতি এবং নাইজার এর অংশগ্রহণে গঠিত হয়েছে। এই বাহিনী বিভিন্ন দলের মধ্যকার বিবাদ মীমাংসার চেষ্টাতেও কাজ করছে।
এরই মধ্যে ফ্রান্স এই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতির পরিধি আরো বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। সাহেল অঞ্চলে ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের দমনে বর্তমানে সেখানে সাড়ে চার হাজার সৈন্য অবস্থান করছে। এদিকে ফেব্রুয়ারি মাসের আরেক নির্দেশে নতুন করে আরো ৬০০ সৈন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অন্যদিকে জি-৫ বাহিনী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ফ্রান্স বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করেছে। এমনকি গোয়েন্দা তথ্যও আদান প্রদানে এই বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে।
সাহেল অঞ্চলে সেনা ক্যাম্পগুলো লক্ষ্য করে প্রায়ই আল-কায়েদাপন্থী জঙ্গিরা হামলা চালায়। ওই মরু অঞ্চল বিদেশিদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হওয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা থাকত সবসময়। তবে জঙ্গিরা বিভিন্ন সময় এই অঞ্চল পর্যটকদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। এতে করে সেখনকার পর্যটন ব্যবস্থাও নিরাপত্তা সংকটে রয়েছে। অঞ্চলটির উগ্রপন্থীদের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের যোগসূত্র রয়েছে।
পাও সামিটের সময় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এরই মধ্যে সাহেলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে ফ্রান্সের সৈন্যরা প্রস্তুত রয়েছে। ফ্রান্সের বিরোধীতাকারী সন্ত্রাস দলগুলোর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, মানবাধীকার লঙ্ঘন ও বিনা বিচারে হত্যার মতো ঘৃণ্যতম কাজগুলোর জন্য অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা হবে। তাদের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের সৈন্যরা যুদ্ধ করছে। শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
সাহায্য প্রদানকারী সংস্থাগুলো বলছে, সাহেল অঞ্চলের সামরিক প্রতিক্রিয়া একটি বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করছে। জনজীবন অতীষ্ট হয়ে পড়ছে। পর্যবেক্ষকরা এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।