অনলাইন ডেস্ক : শিশু কোলে এক রোহিঙ্গা নারীমিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের ধর্ষণের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীদের অনেকে ইতোমধ্যে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। প্রসবের সময় অনেক শিশু মারাও যাচ্ছে। তবে মা ও সন্তানদের মেনে নিচ্ছে না ধর্ষণের শিকার ওই নারীদের পরিবার ও সমাজ।
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব মতে, প্রতিমাসে রোহিঙ্গা শিবিরে জন্ম নিচ্ছে প্রায় দুই হাজার শিশু। আর জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের হিসাবে প্রতিদিন জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা ৬০টি। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার রোহিঙ্গা নারীদের জন্ম দেওয়া শিশুদের কোনও পরিসংখ্যান বাংলাদেশ সরকার বা জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর কাছে নেই।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আবদুস সালাম বলেন,‘প্রতিমাসে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রায় দুই হাজার শিশু জন্ম নেয়। আগামী দুই-একমাসের মধ্যে সন্তান প্রসব করবেন এমন আরও প্রায় ৩২ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন।’
সিভিল সার্জন জানান, সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় মা বা নবজাতকের মৃত্যুর খবর তিনি শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনও হিসাব তাদের কাছে নেই। এছাড়া, ধর্ষণের শিকার কতজন নারী সন্তান জন্ম দিয়েছেন বা দেবেন সেই পরিসংখ্যানও নেই।
এদিকে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৬০টি শিশুর জন্ম হচ্ছে বলে গত ১৭ মে এক বিবৃতিতে জানায় ইউনিসেফ। তাদের হিসাবে ৯ মাস আগে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সংকট শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৬ হাজারের বেশি শিশুর জন্ম হয়েছে। তবে রাখাইন রাজ্যে ধর্ষণের শিকার রোহিঙ্গা নারীদের মধ্যে কতজন সন্তান জন্ম দিয়েছেন, বা দেবেন তা জানা ‘অসম্ভব’ বলে ইউনিসেফের ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারী ও তাদের শিশুদের মানছে না পরিবার- সমাজ
রাখাইন থেকে পালিয়ে টেকনাফের লেদার তুলাবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেন জাহেরা বেগম। বুধবার (৬ জুন) সকালে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘মিয়ানমারে সেনারা আমাকে ধর্ষণ করায় অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ি। বাংলাদেশে আসার পর গত মাসের শেষের দিকে আমার একটি মেয়ে সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু শিশুটির জন্মের পর আমার পরিবার ও সমাজে বিভক্তি দেখা দেয়। আমার স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করি— আমি ধর্ষণ ও অন্যায়ের শিকার।’
টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে মিয়ানমারে ধর্ষণের শিকার অন্তঃসত্ত্বা এক রোহিঙ্গা নারীজাহেরা বেগম আরও বলেন, ‘নৃশংসতার ফলে পৃথিবীতে আসা শিশুটির কোনও দোষ নেই। কিন্তু তারপরও শিশুটিকে কেউ স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না।’
একই দিনে ওই শিবিরে সন্তান হারিয়ে কাদঁছিলেন রোহিঙ্গা নারী রুবাইদা বেগম (ছদ্মনাম)।রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তিন সদস্যের ধর্ষণের শিকার হন তিনি। এরপর নভেম্বরের শুরুতে পালিয়ে এসে তুলাবাগানের রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেন। তার বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উডং গ্রামে। তিনি জানান, এক সপ্তাহ আগে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বাংলাদেশ-জার্মান সম্প্রীতি সংস্থা নামে একটি এনজিও’র হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানে তার ছেলে শিশু জন্ম নেয়। কিন্তু অল্প সময় পরেই শিশুটি মারা যায়। রুবাইদা বলেন, ‘এ দুঃখের কথা বলি কারে। ’
ধর্ষণের শিকার হয়ে উখিয়া মধুরছড়া রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন আরেক রোহিঙ্গা নারী সকুরা বেগম (ছদ্মনাম)। তিনি জানান,সাত মাস আগে মিয়ানমার সেনাদের হাতে ধর্ষণের শিকার হন তিনি। তার স্বামী দিলু আলমকে হত্যা করে সেনারা। এরপর দুই সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন তিনি। বাংলাদেশে আসার পর সকুরা যখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তখনও তিনি জানতেন না যে, ধর্ষণের কারণে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসক তাকে বলে দেন— ‘এখন সন্তান নষ্ট করলে তার জীবনের ঝুঁকি তৈরি হবে।’
সকুরা বেগম ১৫ দিন আগে ঝুপড়ি ঘরে জমজ সন্তানের জন্ম দেন। দুইটি সন্তানই মেয়ে। এর মধ্যে একটি শিশু মারা যায়। সকুরা বলেন, ‘মনে হয় কোনও পাপের ভার শিশুটির ওপরে পড়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জন্মের পর থেকে কিছুতেই শিশুর কান্না থামছে না।বুঝতে পারছি না, কেন শিশুটি রাত-দিন শুধু কান্না করে। শিশুর হাত-পাও খুব বেশি চিকন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। এছাড়া আশেপাশের লোকজনও এই শিশুকে ভিন্ন চোখে দেখছে।’
টেকনাফের শামলাপুর আছর বনিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরের মাঝি আলী হোসেন বলেন, ‘মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীরা ইতোমধ্যে সন্তান জন্ম দিতে শুরু করেছেন। গত এক সপ্তাহে তার শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ১০ রোহিঙ্গা নারী সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। অবশ্য দুজনের সন্তানই মারা গেছে। যেসব শিশুর জন্ম হয়েছে, তাদের অনেকে অপুষ্টিতে ভুগছে।’
শিবিরে কর্মরত স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ধর্ষণের শিকার অনেক রোহিঙ্গা নারী গর্ভপাত ঘটিয়েছেন। জন্ম নেওয়া এসব শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণ ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি এই শিশুদের কারণে রোহিঙ্গা নারীদের লোমহর্ষক নির্যাতনের দিনগুলো মনে করিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি শিশুদের পরিচয় সংকটও রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। তাদের বেশির ভাগই নারী এবং শিশু।
টেকনাফ উপজেলার লেদা, উনচিপ্রাং, শামলাপুর, শীলখালী, নয়াপাড়া মৌচনি, উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা শিবিরের নেতারা জানান, ধর্ষণের কারণে অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গা নারীরা সন্তান প্রসব করতে শুরু করেছেন। ধর্ষণের বিষয়টি শুরুতে কেউ বলতে না চাইলেও এখন কেউ কেউ তা বলছেন। কেননা, অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ায় বিষয়টি আর গোপন থাকছে না। এসব নারী এখন সন্তান প্রসব করতে শুরু করেছেন। অনেকের সন্তান মারাও যাচ্ছে। শিবিরে এসব বলাবলি করতে শুনেছেন তারা।
বিজিএস (বাংলাদেশ- জার্মন সম্প্রীতি সংস্থা) ও এমএসএফের তথ্য মতে, এ পর্যন্ত তারা ৫৫০ জন রোহিঙ্গা নারীকে চিকিৎসা দিয়েছে। এদের মধ্যে দেড় শতাধিক নারী রাখাইনে যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হন। তবে এমন হাজারো নারী আছেন— যারা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েও সামাজিক কারণে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে সাহায্য নিতে আসেননি। তারা বাসায় গর্ভপাতের চেষ্টা চালিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।
বিজিএস অফিসের কর্মকর্তা ডা. মুমিনুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত একমাসে অন্তঃসত্ত্বা দেড় শতাধিক নারীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ জন নারী সন্তান প্রসব করেছেন। পাচঁটি নবজাতক শিশু মারা গেছে। রোহিঙ্গা শিবিরে অনেক নারী অন্তঃসত্ত্বা হলেও অনেকে লজ্জায় চিকিৎসা নিতে আসেননি। আমাদের লোকজন তাদের খুঁজে খুঁজে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ’
আইওএম -এর জাতীয় যোগাযোগ কর্মকর্তা শিরিন আকতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইওএম স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কাজ করছে।মায়েদের মৃত্যুর হার কমানোর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্রক্রিয়া সংগঠিত করা হয়েছে।’ তবে সম্প্রতি জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ও শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যা জানাতে পারেননি শিরিন আকতার।