গনেশ চন্দ্র হাওলাদার :

বাংলাদেশে অবাধ তথ্য প্রবাহ ও শক্তিশালী গনমাধ্যমের কারনে ইভ টিজিং, যৌন হয়রানী, ধর্ষণের মত ঘটনাগুলো সবাই জানতে পারছে। কিশোরী মেয়েরা বিশেষ করে স্কুলগামী ছাত্রীরা ইভ টিজিংয়ের শিকার বেশী হয় এবং একারণে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে। যৌন নির্যাতন করা, পর্নোগ্রাফি তৈরিতে ব্যবহার করা এমনকি খুন করার কথাও পত্রিকার পাতাতে প্রায়ই দেখা যায়। প্রতিদিনের পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের খবরে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকাতে যৌন নির্যাতনের এক বা একাধিক ঘটনা আমাদের জানতে কিংবা শুনতে হচ্ছে। ২-৩বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৫০-৬০ বছরের পৌঢ়া কিংবা বৃদ্ধা কেহই রেহাই পাচ্ছে না এরকম চরম অবমাননাকর ও নিষ্ঠুর ঘটনাবলীর করাল গ্রাস থেকে। চিরাচারিত শ্বাশত বাংলাদেশের বাঙালিপনা সামাজিক রীতিনীতি ও আবহে প্রাচীনকাল থেকেই এ দেশের মানুষ মানুষ শান্তিপ্রিয়। কিন্তু দেশ যেখানে সবদিক দিয়ে উন্নতির দিকে যাচ্ছে সেখানে নারী ও শিশুদেরকে যদি সর্বদা অজানা আংশকার মধ্যে থাকতে হয়, সেটাওতো কারও কাম্য হতে পারে না। কেননা এ জাতীয় প্রতিটি ঘটনা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের প্রত্যেকের জীবনধারায় যেমন আমৃত্যু দুর্বিষহতা নিয়ে আসে তেমনি সমাজের অন্যদের জীবনেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, যা সামাজিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে।

পৃথিবীর দেশে দেশে আইন করে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ করা হয়েছে। আমাদের দেশেও এ বিষয়ে কঠোর আইন রয়েছে। তবে সব দেশে আইন এক নয়। এ ছাড়া আইন থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে কিছু পরিমাণে শিশু নির্যাতন চলছেই দেশে দেশে। বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের ওপর পরিসংখ্যান তেমন একটা পাওয়া যায় না। তবে অন্যান্য দেশে এ বিষয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় চাইল্ড প্রোটেক্টিভ সার্ভিসেস এজেন্সি কর্তৃক প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায় এর আগের বছরের কেসগুলোর মধ্যে ৭৮.৩% ছিল শিশুকে অবহেলা করা, ১৭.৬% ছিল শারীরিক নির্যাতন, ৯.২% ছিল যৌন নির্যাতন এবং ৮.১% ছিল মানসিক নির্যাতনের কেস। ভারতের আরএএইচআই নামের দিল্লির একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা যায়, উত্তরদাতাদের ৭৬% শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এর মধ্যে ৪০% পরিবারের সদস্যদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৭৩০ জন শিশু নির্যাতন বা তার সঙ্গে জড়িত বিষয়াদির কারণে মৃত্যুবরণ করেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশে কি শিশু নির্যাতন হয়? এ বিষয়ক গবেষণা নেই বললেই চলে। তবে জাতীয় দৈনিকগুলোর রিপোর্ট, পুলিশ কেস ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে এ ধরনের নির্যাতন হচ্ছে। গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশু, বিশেষ করে মেয়েশিশুরা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

নারী ও শিশু যৌন হয়রানীর মধ্যে সবচে গুরুতর অপরাধ ‘ধর্ষণ’। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে গনধর্ষন ঘটনা বৃদ্ধি। এমনকি আত্মীয় সম্পর্কীয় ব্যক্তি, প্রতিবেশী কিংবা প্রেমিক কর্তৃক এরকম জঘণ্য নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন আমাদেও দেশের শিশু, কিশোরী, যুবতী বিবাহিত অবিবাহিত নারীরা। গত কয়েকদিনের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি ঘটনার দিকে নজর দিলে দেখা যায়-
সিরাজগঞ্জ শহরে আট বছরের এক শিশু দুপুরে স্কুল থেকে ফেরার পর বাড়িতে একা থাকার সুযোগে তার খালাত ভাই জীবন ওই সময় বাড়িতে গিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। অভিযোগ পেয়ে তার খালাত ভাইকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
রাজধানীর রূপনগর থানাধীন দুয়ারীপাড়া এলাকায় ব্র্যাক স্কুলের প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রী (১২) ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে শিশুটির খালাতো বোনের স্বামী ও তার দুই সহযোগী শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। শিশুটির পরিবার সূত্র জানায়, শুক্রবার বিকেলে শিশুটিকে জোর করে টেনে বাড়ির পাশের আরেকটি বাড়িতে নিয়ে যায় তার খালানো বোনের স্বামী আজাদ ও আরও দুই ব্যক্তি। সেখানে শিশুটিকে ধর্ষণ করেন তারা।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে উপজেলার চিতুলিয়াপাড়া গ্রামের শাহজাহানের ছেলে ঢাকার উত্তরা ইউনিভার্সিটির ছাত্র রিপন (১৮) মোবাইল ফোনে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে যমুনা সেতুর কাছে বেলটিয়া এলাকায় বেড়াতে নিয়ে যায়, সেখানে আগে থেকেই নৌকা ভাড়া করে তার অন্য তার সহযোগী কোরবান (২৪) ও রুবেল (২২অপেক্ষায় ছিল। ছাত্রীটিকে নদী দেখানোর কথা বলে নৌকায় তুলে মাঝ নদীতে নিয়ে তারা ধর্ষণ করে। ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ধর্ষণ এবং সেই ভিডিওচিত্র মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নোয়াখালীর সেনবাগে এক কিশোরী বিকেলে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় সিলোনিয়া বাজারের দর্জি দোকানের মালিক রাজু জামা দেওয়ার কথা বলে তার মেয়েকে দোকোনে ডেকে পাঠান। জামা আনতে গেলে রাজু তার মেয়ের মুখ ও হাত-পা বেঁধে দোকানে তালা দিয়ে চলে যায়।“পরে রাতে রাজু তার সহযোগী রবিন ও শাহাদাতকে নিয়ে মেয়েকে ধর্ষণ করে। ঘটনা জানতে পেরে পুলিশ কিশোরীকে উদ্ধার করেছে।
বেলকুচি উপজেলার চকমাহমুদ গ্রামের মালেশিয়া প্রবাসীর মেয়ে ও রাজাপুর ডিগ্রী কলেজের প্রথম বর্ষের ওই ছাত্রী ও একই কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র সোহেল রানা’র মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। সম্পর্কের কারনে সোহেল রানা ও তার সহযোগী মিলে মেয়েটিকে ফুসলে বেড়ানোর কথা বলে ইকোপর্কে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে সোহেল রানা মেয়েটিকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করে। মেয়েটির চিৎকার শুনে পার্ক কর্তৃপক্ষ সোহেল রানা ও তার সহযোগী কবিরকে আটক করে পুলিশে সোর্পদ করেন।
রাজধানীর সুবজবাগে বীমা করার প্রলোভন দেখিয়ে বীমা কোম্পানির এক মাঠকর্মীকে (১৬) ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের ছোট মিলনায়তনে গত শুক্রবার ( ১১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে ২০১৩ সালে ফেনীর দাগনভূঞায় ঘটা এ ঘটনায় ধর্ষিত পরিবারের ওই গৃহবধূ জানান, ২০১২ সালে তার স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর তিনি স্থানীয় জামাল উদ্দীনকে বিয়ে করলেও জনৈক প্রভাবশালী মামুনের হুমকিতে দুইমাস পর তাদের বিচ্ছেদ হয়। ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তার বড় মেয়েকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় মামুনের লোকজন। তারা তাকে ফোন দিলে তিনি মেয়েকে আনতে মামুনের বাসায় যান। তখন মামুন তাকে ধর্ষণ করেন। এ সময় ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে ছয়টি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে কয়েকটি দোকানসহ সম্পত্তি হাতিয়ে নেন মামুন। তবে পরবর্তীতে ভিডিওটি ফেসবুকের মাধ্যমে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, ধর্ষণের পর মামুনের ছোট ভাই লিটু তাকে নিয়ে একটি বাড়িতে যায়। সেখানে তার ১৩ বছরের ছোট মেয়ের সামনে তাকে ও তার বড় মেয়েকে ১৪ জনে ধর্ষণ করে। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে র‌্যাবের একটি টিম তাদের উদ্ধার করে।
গত ০৬/০৪/২০১৫ তারিখে বাংলাদেশে ডাক্তারী পড়তে আসা সিটি ডেন্টাল কলেজের ১ম বর্ষের নেপালী শিক্ষার্থীকে নেপালী নাগরিক অরুণ কুমার চৌধুরী ও বিল্ডিং এর কেয়ারটেকার হাক্কানী ওরফে বাদশা পরস্পর যোগসাজশে নেপালী ছাত্রীকে মোহাম্মদপুর হাউজিং এর ৮২/২ বিল্ডিং এ কৌশলে ডেকে নিয়ে এসে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পূর্বে তারা তাকে নেশাদ্রব্যযুক্ত পানীয় পান করায়। মেয়েটি অচেতন হয়ে পড়লে অরুণ এবং হাক্কানী তাকে ধর্ষণ করে। এ সংক্রান্ত রামপুরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়েরর পর গত ০৯/০৪/২০১৫ তারিখে নেপালী নাগরিক আসামী অরুণ কুমার চৌধুরীকে এবং ১২/৯/১৫ তারিখ বাদশাকে গ্রেফতার করে।
প্রেমের প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় হবিগঞ্জে প্রকাশ্যে অন্য বান্ধবীদের সামনে স্কুল ছাত্রীকে চড় থাপ্পর ও গালিগালাচ করে বন্ধুদের দিয়ে তা মোবাইলে ভিডিও করে ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার সাম্প্রপ্রতিক ঘটনা ও পরবর্তীতে সামাজিক প্রতিরোধে পুলিশের নজরে এলে তাকে গ্রেফতার করে আদালতের নিদের্শে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো সম্পর্কে সকলে অবগত।
গত ২১ মে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় ৫ দুর্বৃত্ত মাইক্রোবাসে তুলে এক কর্মজীবি গারো তরুণীকে গণধর্ষণ করে।

পুলিশ সদর দফতর হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালে ৪ হাজার ৬৪২টি ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৩৮টি। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে ৭৯৭টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে। এ তথ্য অনুসারে, প্রতিমাসে অন্তত ৩০০টি ধর্ষণের মামলা দায়ের হচ্ছে। তবে বাস্তবে ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা মামলার চেয়ে দ্বিগুণ হবে।কেননা অনেকেই লোক লজ্জার কারনে কিংবা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে পারিবারিকভাবে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির দেওয়া তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ মে পর্যন্ত সারা দেশে ২৪১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির মতে, ২০১০ সাল থেকেই ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে চলেছে। তাদের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ৭৮৯, ২০১৩-তে ৭১৯, ২০১২-তে ৮৩৬, ২০১১-তে ৬০৩ এবং ২০১০-এ ৪১১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকার ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের গত ১৪ বছরের তথ্য সংগ্রহ করে দেখা যায়, কমপক্ষে ৫ হাজার ৩২১ জন নারী এই সেন্টারে সহযোগিতা চেয়েছেন। যারা মানসিক কিংবা শারীরিকভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
পুলিশ ২০১৩ সালে ২ হাজার ৯২১ এবং ২০১৪ সালে ২ হাজার ৯১৮টি মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করছে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৪৩৭ ও ১ হাজার ৫৬৪টি।
জাতীয় মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৪৩১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৮২টি গণধর্ষণের ঘটনা এবং ৪৫টি ঘটনায় ধর্ষণের পর মেয়েটিকে মেরে ফেলা হয়েছে।

বিবাহিত নারীরাও ঘরে বাইওে বিভিন্ন সময়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। এমনকি স্বামী কর্তৃক যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রায়শ ঘটছে। সম্প্রতি প্রাক্তন স্বামী একা ও দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের ঘটনা সকলের অবগত।
নারী নির্যাতন নিয়ে সরকারের প্রথম জরিপ সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর অগ্রগতি বড় ভূমিকা রাখলেও ঘরের মধ্যে নারীর অবস্থা তেমন বদলায়নি। দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনো সময়ে, কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেছেন, ৩৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক এবং ৫৩ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
বিস্ময়কর আরও তথ্য হচ্ছে, এসব নারীর ৭৭ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা বিগত এক বছরেও একই ধরনের নির্যাতন ভোগ করেছেন। বড় অংশের নারীকেই তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক গড়তে বাধ্য হতে হয়েছে।
নারী নির্যাতন নিয়ে প্রথমবারের মতো ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডবি¬উ) সার্ভে ২০১১’ শীর্ষক এই জরিপ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এই জরিপে বলতে গেলে প্রায় অপ্রকাশ্য এ ধরনের যৌন নির্যাতনের চিত্রটি প্রকাশ পেয়েছে। গত ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে জরিপটি প্রকাশ করা হয়।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় ২০১১ সালের ১৯ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে স্বামীর মাধ্যমে যৌন নির্যাতন বলতে স্ত্রীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করা, স্বামীর নির্যাতনের ভয়ে শারীরিক সম্পর্কে সম্মত হওয়া, শারীরিক সম্পর্ক ছাড়াও স্ত্রীকে এমন কিছু করতে বাধ্য করা যা স্ত্রী করতে চান না অথবা এতে অপমানিত বোধ করেন অথবা অন্যান্য যৌন নির্যাতনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ১২ হাজারের বেশি নারী তথ্য দিয়েছেন।
স্বামীর মাধ্যমে যে যৌন নির্যাতন হয়, সেটিকে ‘নির্যাতন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। তবে বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে (২০০০, সংশোধিত ২০০৩) বিবাহিত নারীদের যে যৌন অধিকার আছে বা স্ত্রীর অমতে স্বামী যে কোনো ধরনের যৌন আচরণ করতে পারেন না, সে বিষয়টির স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
এ আইনে বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ বিবাহবন্ধনের বাইরে ১৬ বছরের অধিক বয়সী কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া বা ভয় দেখিয়ে বা প্রতারণা করে সম্মতি আদায় করে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে, তা ধর্ষণ হবে। অর্থাৎ্, এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয়টিকে আমলে নেওয়া হয়নি।
অন্য একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইসরায়েল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ নারী তাঁদের স্বামী বা ছেলেবন্ধুর হাতে খুন হন।
ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর ২০১১ সালে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বছরটিতে ৪৪ শতাংশ নারী স্বামী বা আত্মীয়স্বজনের মধ্যমে নির্যাতনের শিকার হন।
বিবিএস এ জরিপের জন্য সাতটি বিভাগের সাতটি গ্রাম ও সাতটি শহরকে বেছে নেয়। তারপর গ্রাম ও শহর মিলে ৪২০টি এলাকায় ভাগ করা হয়। একেকটি এলাকায় ৩০টি খানা থেকে একজন করে নারীকে বাছাই করা হয়। ১৫ বছরের বেশি বয়সী ১২ হাজার ৬০০ জন নারীকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১২ হাজার ৫৩০ জন নারী জরিপে তথ্য দেন। জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয় ২০১১ সালের ১৯ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আর গত ৩০ ডিসেম্বর জরিপটি প্রকাশ করা হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, শহরের তুলনায় গ্রামে নারী নির্যাতনের ঘটনা একটু বেশি ঘটে। বয়স অনুযায়ী নির্যাতনের ধরন পাল্টাতে থাকে। আবার যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে অবিবাহিত নারীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও মানসিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিবাহিত নারীরা এর শিকার বেশি হন।
৪ শতাংশ নারী পরিবারের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। গড়ে ৪২ শতাংশ নারী এবং ৫০ শতাংশ শহরের নারী ১৪ বছর বয়সের আগেই যৌনসম্পর্ক করতে বাধ্য হন। এক-তৃতীয়াংশই বলেছেন, তাঁদের প্রথম এ অভিজ্ঞতা হয় ১৯ বছর বয়সে পা দেওয়ার আগেই।

আমাদের দেশে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ জাতীয় সামাজিক অবক্ষয় রোধ করার জন্য প্রতিটি ঘটনায় অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে শিশু কিশোরী তথা নারীদেরকে রক্ষা করতে চেষ্টা করছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের সহায়তা ও নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন ফর ভায়োলেন্স এগেইন্সট ওমেন অ্যান্ড চিলড্রেন নামের ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে এমন একটি টেলিফোন নম্বর চালু করা হয়েছে। ১০৯২১- এই নম্বরে ফোন করলে নির্যাতিত শিশুকে উদ্ধারের ও সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজগুলোতে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই সেন্টারগুলোতে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের শারীরিক চিকিৎসা, মানসিক চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, আবাসন সাহায্য করা হয়। এ ছাড়া ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স নামের একটি এনজিও শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করছে। তারা নির্যাতিত শিশুদের কাউন্সেলিং সেবাও দিচ্ছে। ০১৭৭৮২৪৯২৭৭- এটি তাদের হটলাইন নম্বর যা ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা এই নম্বরে ফোন দিয়ে জানালে তারা শিশুকে উদ্ধার ও তার সমর্থন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেবে।

তবে বিশ্বায়নের প্রভাবে প্রযুক্তি এত বেশি দ্রুত এগোচ্ছে, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেইসবুক, টুইটার সহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলোর ভাল কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি অপব্যবহারের মাত্রাও বাড়ছে সাথে সাথে বাড়চ্ছে যৌন নির্যাতনের মত ভয়াবহ সামাজিক অপরাধ। অসুস্থ ওয়েবসাইটের অসুস্থ প্রভাবে (যেমন, পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইটগুলো) মানুষের মধ্যে কিশোরী মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করার একটি প্রবণতার বিকাশ লাভ করছে যা যৌন নির্যাতন বাড়াবে। এছাড়া ভিনদেশী সংস্কৃতির খারাপ দিকগুলো খুব সহজেই আমাদের দেশের কোমলমতী শিশু কিশোর-কিশোরী থেকে বিরাট একটা অংশ নিজেদের লাইফস্টাইলে অর্ন্তভ’ক্ত করে নিচ্ছে। অল্প বয়সে প্রেম-ভালবাসার অলীক সম্পর্কে জড়িয়ে পরিনাম না ভেবে সেক্সকে যেভাবে ফ্যাশন হিসেবে নিচ্ছে একশ্রেণীর কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা, যেভাবে বিয়ে বর্হিভ’ত সম্পর্ক বা লিভটুগেদার, পরোকিয়ার মত ব্যাপারে নৈতিকতার কোন বালাই মানছে না তাতে সমাজের অবক্ষয়মূলক এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরো নিয়ন্ত্রন করা অসম্ভব ব্যাপার।
এধরণের সহিংসতা এক দিকে যেমন নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে অন্যদিকে তা পরিবার, সন্তানাদি এবং অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সে আত্মহত্যাপ্রবণ হয় ও নিজের ক্ষতি নিজেই করে, যেমন, নিজেকে কাটে, দেয়ালে মাথা ঠুকে। সে নিজেই নিজেকে দোষী ভাবে, নির্যাতনের ঘটনাটি তার বারবার মনে পড়ে, এমনকি নির্যাতনের দৃশ্যটি তার চোখে এমনভাবে বারবার ভেসে ওঠে যেন ঠিক সেই মুহূর্তেই এটি ঘটছে। তার প্রতিক্রিয়াও তেমনি হয়। সে ঘুমাতে পারে না বা ঘুমালেও বারবার ঘুম ভেঙে যায়। সে দুঃস্বপ্ন দেখে। নির্যাতিত শিশু কিশোরিদের ব্যবহার খারাপ হয়ে যেতে পারে। তার রাগ বেড়ে যেতে পারে। তার আচার-আচরণের সঙ্গে বড়দের খাপ খাওয়াতে রীতিমতো সমস্যা হতে পারে। অনেক সময় তারাযৌন বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। ফলে সে ক্রমান্বয়ে অনেকবার যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে। ভিয় পেতে পারে। তার মধ্যে নানা ধরনের উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পায় না। তার মনোযোগ কমে যায়, স্মৃতিশক্তি, সামাজিক দক্ষতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বিঘ্নিত হয়। তার যতœ গ্রহণকারীকে বিশ্বাস করতে পারে না। কারো সঙ্গেই সে ভালোবাসাময় বিশ্বাসের সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। ফলে ভবিষ্যৎ জীবনে কাউকে ভালোবাসতে বা বিবাহের পর স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করতে তাদের সমস্যা হয়। বিশ্বাসের অভাবের কারণে কারো সঙ্গে সাধারণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক করতেও তাদের সমস্যা হয়।অনেক সময় নির্যাতিত শিশুর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি হয়। যেমন, সে সেক্সুয়াল ডিজফাংশন, মাদকাসক্তি, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, ভীতি, পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিজঅর্ডার, কনভারশন ডিজঅর্ডার, সোমাটাইজেশন ডিজঅর্ডার, বর্ডার লাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার, অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা, বিউলিমিয়া নারভোসা ইত্যাদি মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়।

এ অবস্থা উত্তরনে মা-বাবাকে শিশদের প্রতি সর্বদা নজর রাখার পাশাপাশি, কিশোর-কিশোরীদের নৈতিকতা শেখাতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা এ ক্ষেত্রে ভালো একটি উপায় হিসেবে কাজ করে। শিশুকে শেখাতে হবে যাতে সে অন্যদের কাছ থেকে বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়া কোনো খাবার না খায় বা কোনো উপহার বা টাকা পয়সা না নেয়। কিশোর বয়সে ছেলে মেয়েরা যাতে খারাপ কোন কিছুর প্রতি আসক্ত হয় সেদিকে যেমন খেয়াল রাখতে হবে তেমনি তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে। যাতে করে যে কোন ধরনের ভুল বা কোন অবাঞ্চিত পরিস্থিতি সে মা-বাবার সাথে শেয়ার করে, তাতে করে বড় ধরনের বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। নারীরা নির্ভয়ে জীবন গড়তে পারলে তা দেশের জন্য সমাজের জন্য সার্বিক কল্যান বয়ে আনবে। আসুন পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়ে সকলে মিলে একটি আধুনিক সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে যৌন নির্যাতন চিরতরে বন্ধ করি।
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।