অনলাইন ডেস্ক :

ট্রফি…এই একটি জিনিসের পরশ কে না পেতে চান? শিল্পী তার শিল্পকর্ম দিয়ে, খেলোয়াড় তার খেলোয়াড়ি নৈপূণ্য দিয়ে এটি অর্জন করতে চান। অর্থমূল্যে কম হলেও, এ ট্রফি আদতে মহামূল্যবানের চেয়েও বেশি কিছু, অমূল্য। ক্রিকেটার হোক আর ফুটবলার হোক, সবাই ট্রফির নেশায় বিভোর থাকেন। আর সে ট্রফির নামটি যদি ‘ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি’ হয়, তাহলে তো কথাই নেই। সবার স্বপ্নচূড়া তো এই বিশ্বকাপ শিরোপাটিই। ৩৬.৮ সেন্টিমিটার উচ্চতার, ৬.১৭৫ কেজি ওজনের আর ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের তৈরি এই বিশ্বকাপ ট্রফির জন্যই সব আয়োজন, সব লড়াই।

যে ট্রফিতে চুমু এঁকে দেওয়া বিশ্বের সব ফুটবলারের আজন্ম আরাধ্য স্বপ্ন। বিশ্বব্যাপী যে ট্রফির এত কদর, যাকে স্পর্শ করার জন্য সব ফুটবলারের এতো সাধনা-সেই ট্রফির আসল ইতিহাস কী? শুরু থেকেই কি ট্রফি এরকম ছিল? কখনও কি এটি পরিবর্তিত হয়েছে? আসুন জেনে নিই ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির পূর্বাপর।

১৯৩০ সালে শুরু হওয়া প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফিটি কিন্তু এখনকার ট্রফির মতো ছিল না। বর্তমান ট্রফিটি মূলত দ্বিতীয় প্রজন্মের। চ্যাম্পিয়ন দলকে পুরস্কৃত করার জন্য প্রথমে ‘ভিক্টরি’ নামের একটি ট্রফির প্রচলন করা হয়েছিল, যা বিশ্বকাপ বা কোউপ ডু মোন্ড নামে পরিচিত ছিল। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে ফিফার তৃতীয় সভাপতি জুলে রিমের সম্মানার্থে তার নামানুসারেই ট্রফিটির নামকরণ হয় ‘জুলে রিমে’।

স্টার্লিং সিলভার ও নীলকান্ত মনি দিয়ে এ ট্রফিটি তৈরি করেন ফ্রান্সের ভাস্কর অ্যাবেল লাফলিয়ার। তিনি ট্রফিটির নাম দেন ‘গোল্ডেন গডেজ’। প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার উঁচু এবং ৩.৮ কিলোগ্রাম ওজনের ট্রফিটিতে অঙ্কিত ছিল বিজয়ের প্রতীক গ্রিক দেবী ‘নাইকি’র ছবি, যিনি অষ্ঠকোণী মশাল মাথার ওপর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত নয়টি বিশ্বকাপজয়ী দলের নাম ট্রফিটির ভিত্তিপ্লেটের চারপাশে খোদাই করে লেখা রয়েছে।

‘জুলে রিমে’ ট্রফিকে নিয়ে শুধু এতটুকুই নয়, রয়েছে একটি ঘটনাবহুল চমকপ্রদ ইতিহাসও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই ট্রফিটি ছিল ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ইতালি দলের কাছে। নাৎসিদের কাছ থেকে রক্ষা করার জন্য ফিফার তৎকালীন সহসভাপতি ও আইজিসির সভাপতি ইতালির অধিবাসী অট্টরিনো বারাসিস খুব সন্তর্পণে এটিকে একটি ব্যাংক থেকে তুলে রোমে নিয়ে যান। সেখানে একটি জুতার বাপে ভরে তার নিজের বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখেন।

এরপর শুধুই বিস্ময়কর সব ঘটনার জন্ম দিয়েছে এই ট্রফি। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তাবলয়ে থাকা সত্ত্বেও টুর্নামেন্টের চার মাস আগে ২০ মার্চ ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হলে আয়োজিত একটি উন্মুক্ত প্রদর্শনী থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। সেদিন ১৫ হাজার পাউন্ড দাবি করা চোরকে খুঁজে বের করতে লন্ডনের সব পুলিশকে মোতায়েন করা হয়েছিল। এর মাত্র সাত দিন পর খবরের কাগজে মোড়ানো অবস্থায় এটিকে দক্ষিণ লন্ডনের আপার নরউড অঞ্চলের শহরতলি বাগান এলাকা থেকে উদ্ধার করে পিকলস নামের একটি কুকুর।

ফিফা খুশি হয়ে উদ্ধার করা ওই কুকুরের মালিককে ছয় হাজার ডলার পুরস্কার দিয়েছিল। আর সেই চোরকে দেওয়া হয় দুই বছরের জেল। এরপর ব্রাজিল ১৯৭০ সালে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করার পর তৎকালীন ফিফার নিয়মানুযায়ী এটি তাদের স্থায়ীভাবে দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ব্রাজিলও ট্রফিটি স্থায়ীভাবে ধরে রাখতে পারেনি। ১৯৮৩ সালের ২০ ডিসেম্বর রিও ডি জেনেরিওতে ব্রাজিল ফ্রটবল সংস্থার এক প্রদর্শনী বাপ থেকে কাঠের অংশটি ভেঙে কাপটি পুনরায় চুরি হয়ে যায়।

তবে এবার আর ট্রফিটি পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, চোরেরা দ্বিতীয়বারের মতো চুরি হওয়া ট্রফিটিকে গলিয়ে ফেলেছে। অবশ্য বর্তমানে ব্রাজিলে সেই ট্রফির একটি রেপ্লিকা রয়েছে। কনফেডারেশন তাদের নিজেদের জন্য ইস্টম্যান কোডাককে দিয়ে ১.৮৮ কেজি (৩.৯৭ পা.) স্বর্ণ দ্বারা একটি রেপ্লিকা তৈরি করিয়েছে। সর্বশেষ এ ধরণের ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। ২০১০ সালের ১১ জুলাই স্পেন বনাম নেদারল্যান্ডসের ফাইনাল ম্যাচে জিম্মি জাম্প নামক এক স্প্যানিশ মাঠের মধ্য থেকে ট্রফিটি ছিনিয়ে নিতে উদ্ধত হলে তাকে অল্প জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এবার আসা যাক বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিতে। বিশ্বকাপের বর্তমান ট্রফির প্রবর্তন ১৯৭৪ সালে। এটি একটি স্বর্ণ নির্মিত ট্রফি, যেখানে ১৮ ক্যারেট (৭৫ ভাগ) স্বর্ণ রয়েছে। এর ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে ম্যালাইকাইট নামক ধাতু দ্বারা। ট্রফিটির ভিত্তির ব্যাস ১৩ সেন্টিমিটার। গ্রিক দেবী নাইকির পরিবর্তে বর্তমান ট্রফিতে অঙ্কিত রয়েছে দু’জন মানুষের প্রতিকৃতি, যারা পৃথিবীকে ধরে আছে। ট্রফির সামনের অংশের নিচের দিকে ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ’ কথাটি লেখা।

১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর সংযোজন করা ট্রফিটির নিচের অংশের একটি প্লেটে লেখা রয়েছে ১৯৭৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন দেশের নাম ও শিরোপা জেতার সাল। এখানে মোট ১৭টি বিশ্বকাপজয়ী দলের নাম লেখা সম্ভব। যে কারণে ২০৪২ বিশ্বকাপ থেকে নতুন ট্রফি প্রবর্তন করতে হবে ফিফাকে। বিশ্বকাপের বর্তমান ট্রফির নকশাকারী ইতালির সিলভিও গাজ্জানিজা। ট্রফিটি প্রচলনের আগে এর নকশা গ্রহণ করা হয়েছিল ৭টি দেশের ভাস্কর্যশিল্পীদের কাছ থেকে।

মোট ৫৩টি নকশা জমা পড়েছিল। এর মধ্যে গাজ্জানিজার নকশাটিই চূড়ান্ত করা হয়। ট্রফিতে অঙ্কিত মূর্তি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ইতালিয়ান এই শিল্পী তার সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছিলেন- ‘বিশ্বকাপ ট্রফি জয় বিশ্বজয়েরই প্রতিচ্ছবি।’ এরপর ১৯৭১ সালে ইতালির ট্রফি ও মেডেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বার্তোনি, মিলানো (বর্তমানে জিডিই বার্তোনি নামে পরিচিত) থেকে ট্রফিটি প্রস্তুত করা হয়।

প্রচলিত মতানুসারে, বিশ্বকাপের ট্রফিটি স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত একটি সলিড ট্রফি। তবে ব্রিটিশ রসায়নবিদ মার্টিন পলিয়াকফের মতে, বিশ্বকাপের ট্রফিটি আসলে ফাঁপা একটি শিরোপা। কেননা, যদি এটি সলিড হতো তাহলে ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের কারণে এর ওজন হতো ৭০ থেকে ৮০ কিলোগ্রাম, যা হাতে নেওয়া কষ্টসাধ্য ব্যাপার হতো। বর্তমানে বিশ্বকাপ জিতলে ট্রফিটি আর স্থায়ীভাবে দেওয়ার নিয়ম নেই।

বিশ্বকাপের ফাইনালের দিনে ট্রফিটি একটি নির্দিষ্ট কেস বা বাপে করে মাঠে আনা হয়। প্রতিবারের চ্যাম্পিয়নদের মূল ট্রফির আদলে স্বর্ণপ্লেটের তৈরি ব্র্রোঞ্জের একটি রেপ্লিকা দেওয়া হয়। মূল ট্রফিটি জুরিখের বিশ্ব ফুটবল জাদুঘরে সংরক্ষিত করা আছে। ফিফা বিশ্বকাপ ভ্রমণ, পরবর্তী বিশ্বকাপের ফাইনাল ড্র এবং বিশ্বকাপ আসরের ফাইনাল ম্যাচে প্রদর্শনী ব্যতীত কাপটিকে কখনোই বের করা হয় না। কাপটি বহন করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান থেকে কেসটি বানানো হয়।

বিশ্বের সব ফুটবলপ্রেয়সীর এই মহামূল্যবান ট্রফি এক নজর দেখানোর লক্ষ্যে ফিফা ‘ট্রফি বিশ্বভ্রমণ’ ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। ২০০৬ সালের জার্মান বিশ্বকাপ থেকে শুরু হওয়া এই ভ্রমণ ব্যবস্থায় সে বছর তিন মাস ধরে ট্রফিটি ২৯টি দেশ ঘোরে। ২০১০ সালের বিশ্বকাপে আফ্রিকার ৫০টি দেশসহ মোট ৮৪টি দেশ প্রদক্ষিণ করে।

ব্রাজিল বিশ্বকাপে ৯০টি দেশে ২৬৭ দিন ধরে ১.৩ মিলিয়ন ফুটবল ভক্তের আকর্ষণ মিটিয়েছে ভ্রমণ ব্যবস্থার মাধ্যমে। রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮ উপলক্ষে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হওয়া এবারের ভ্রমণে ৬টি মহাদেশের ৫০টি দেশ প্রদক্ষিণ করেছে ট্রফিটি, যার সমাপ্তি ঘটে ২০১৮ সালের ৭ জুন মস্কোতে। এখন সবার নজর ১৫ জুলাই মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামের দিকে। ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ীর হাতে ট্রফিটি উঠবে ওইদিনই।

পরিসংখ্যান :

জুলেরিমে কাপ :

ব্রাজিল- ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০; উরুগুয়ে- ১৯৩০, ১৯৫০; ইতালি- ১৯৩৪, ১৯৩৮; প. জার্মানি- ১৯৫৪; ইংল্যান্ড-১৯৬৬।

ফিফা বিশ্বকাপ:

প. জার্মানি- ১৯৭৪, ১৯৯০, আর্জেন্টিনা- ১৯৭৮, ১৯৮৬, ইতালি- ১৯৮২, ২০০৬, ব্রাজিল- ১৯৯৪, ২০০২, ফ্রান্স- ১৯৯৮, স্পেন- ২০১০, জার্মানি- ২০১৪ (সূত্র: বিশ্বকাপ ২০১৮ উপলক্ষে সমকালের বিশেষ আয়োজন গোল থেকে নেওয়া)