‘অনলাইন ডেস্ক : তিল ঠাঁই আর নাহি রে…’- এমন অবস্থার মধ্যেই রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটের সামনে কথা হচ্ছিল আজিমপুরের বাসিন্দা আকলিমা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘আগামী শুক্রবারই হয়তো শেষ রোজা। এরপর ঈদ। তার আগেই পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাব। তাই সবার জন্য যা কেনাকাটা করার তা আজই করে নিতে হবে।’ এত ভিড়ের মধ্যেই বিক্রেতাদের কাছে প্রশ্ন ছিল- কেমন হলো রমজানের তৃতীয় শুক্রবারের বেচা-বিক্রি? উত্তর দেওয়ার সময় কোথায়! একাধিকবার জানতে চাইলে প্রশ্নকর্তার দিকে না তাকিয়ে বললেন, ‘ভালো। ভালো।’
রমজান মাসের তৃতীয় শুক্রবার ছুটির দিনে রাজধানীবাসীর কেনাকাটার ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। যেমন ছিল ভিড়, তেমনি ছিল বিক্রি। ফুটপাত থেতে অভিজাত বিপণিবিতান, পাড়া-মহল্লার বুটিক হাউস থেকে নামিদামি ব্র্যান্ডের আউটলেট- সর্বত্রই ছিল রমরমা কেনাকাটা।
রাজধানীর নিউমার্কেট, চাঁদনী চক, গাউছিয়া, এলিফ্যান্ট রোড, ইস্টার্ন প্লাজা, মালিবাগের মৌচাক মার্কেট, ফরচুন শপিংমল, আনারকলি মার্কেট, কনকর্ড টুইন টাওয়ার, ইস্টার্ন প্লাস, নাভানা বেইলি স্টার, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টার, পলওয়েল, গাজী ভবন, পীর ইয়েমেনী, মগবাজারের বিশাল সেন্টার, শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট, পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি মার্কেট, যমুনা ফিউচার পার্ক, গুলশান পিংক সিটি, নাভানা টাওয়ার, কনকর্ড পুলিশ প্লাজা, বঙ্গবাজার, রাজধানী সুপারমার্কেট ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল দারুণ জমে গেছে ঈদের কেনাকাটা। ক্রেতার ভিড়ের এ দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, পুরো রাজধানীই যেন এক বিপণিবিতান!
নিউমার্কেট এলাকা :নিউমার্কেট ও এর আশপাশের এলাকার বিপণীবিতানগুলোতে গতকাল ছিল ক্রেতার উপচেপড়া ভিড়। এসব বিপণিবিতানের শাড়ি, রেডিমেড সালোয়ার-কামিজ এবং শিশুদের পোশাক বেশি বিক্রি হচ্ছে। এখানে দরদাম করে সাধ্যের মধ্যে সাধের পোশাক কিনতে দেখা যায় ক্রেতাদের।
নিউমার্কেটের রফিক ট্রেডার্সের বিক্রয়কর্মী রবিন বলেন, বলা যেতে পারে ঈদের আগে এটাই শেষ শুক্রবার। আগামী শুক্রবারের পরের দিন অথবা তার পরের দিন ঈদ হবে। তাই অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ (গতকাল) চাপ সবচেয়ে বেশি। প্রচুর ভিড় যেমন হয়েছে, তেমনি বিক্রিও হয়েছে দারুণ।
নিউমার্কেটের অনেক দোকানের সামনেই ‘একদর’ সাইন বোর্ড নজরে এসেছে। তবে সেখানেও দরদাম করে কিছুটা ছাড় পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় মার্কেট চাঁদনী চক ও গাউছিয়ায় তরুণীর ভিড় ছিল। হাল ফ্যাশনের পোশাক থেকে শুরু করে অলঙ্কার ও প্রসাধনী, নারীদের সবকিছুই রয়েছে এ দুই বিপণিবিতানে। চাঁদনী চক মার্কেটের শাড়ি ও থ্রিপিস ব্যবসায়ী এনামুল হক ও শামীমা ফেব্রিক্সের ব্যবস্থাপক হানিফ বললেন, ১৫ রোজার পর থেকেই কেনাকাটা জমে উঠেছে। তবে শুক্রবারের ভিড় সব দিনকে ছাড়িয়ে গেছে।
নিউমার্কেট এলাকার বিপণিবিতানগুলোর সামনের খোলা জায়গা ও রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতে ক্রেতার আনাগোনা ছিল বেশি। গাউছিয়া ও নিউমার্কেটের ফুটপাত ঘিরে রয়েছে নারীদের পোশাক ও স্যান্ডেলের বিশাল বাজার। ঢাকার সব বয়েসী নারীর কাছে এই স্যান্ডেলের বাজার খুবই জনপ্রিয়। দাম ১০০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। নারীদের সালোয়ার-কামিজের দোকান বসে গাউছিয়া ও নিউমার্কেটের সামনের ফুটপাতে।
বসুন্ধরা সিটি :গতকাল বসুন্ধরা সিটির প্রবেশপথগুলোতে ছিল ক্রেতার সারি। ভেতরে চলন্ত সিঁড়িতে উঠতে লাইন ধরে খানিকটা সময় দাঁড়াতে হয়েছে। বিপণিবিতানটির আড়ং, স্মার্টটেক্স, জেন্টেল পার্ক, ইয়োলো, দর্জিবাড়ির মতো নামি ব্র্যান্ডের দোকানগুলোতেই ছিল বেশির ভাগ ক্রেতার আনাগোনা।
দুই হাতে নানা রকম পোশাকের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়ানো দুই বন্ধু শুভ ও আল-আমিনের কাছে দাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা বলেন, ঈদের বাজার হিসেবে একটু বেশিই মনে হচ্ছে। তবে মানসম্পন্ন পোশাক কিনে খুশি তারা।
মৌচাক-মালিবাগ-কাকরাইল :রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মৌচাক মার্কেট মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতাদের, বিশেষ করে নারীদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।এখানে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ ও নন-স্টিচ সালোয়ার-কামিজের রয়েছে বিশাল আয়োজন। গতকাল বিপণিবিতানটি ছিল ক্রেতায় ঠাঁসা। মৌচাক মার্কেটের মেসার্স গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী মো. হাবিব ও নিউ আফজাল শাড়ির স্বত্বাধিকারী আবদুর রব জানালেন, এখানে বেচা-বিক্রি ভালো। তবে মালিবাগের হোসাফ মার্কেটে ক্রেতা উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায়নি। শান্তিনগরের কনকর্ড টুইন টাওয়ার ও কাকরাইলের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিতে পাকিস্তানি ও ভারতীয় সালোয়ার-কামিজে কাজের বৈচিত্র্য মন কেড়েছে ক্রেতাদের।
বেইলি রোড :নিউ বেইলি রোডের মিরাজ শপিং সেন্টারে ভোগ-এর আউটলেটে গতকাল ছিল ক্রেতার উপচেপড়া ভিড়। ক্রেতা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন বিক্রয়কর্মীরা। কথা বলে জানা গেল, সাধ্যের মধ্যে নারীদের ভালো মানের পোশাক পাওয়া যায়। তাই দুপুর ১২টার মধ্যেই একদফা সব পোশাক বিক্রি হয়ে যায়। সন্ধ্যায় আবার খোলা হবে। এখানে মেয়েদের টিউনিক ও কুর্তির চাহিদা বেশি। এর পাশাপাশি ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টার ও নাভানা বেইলি স্টারেও গতকাল ছিল ক্রেতার ভিড়। এ দুই বিপণিবিতানে নামিদামি ব্র্যান্ডের পাশাপাশি রয়েছে দেশি বুটিক শপও।
গুলশান-বনানী-বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা :বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার যমুনা ফিউচার পার্কে সকাল থেকেই ক্রেতার ভিড় দেখা যায়। বেশি ভিড় দেখা যায় জুতা, স্যান্ডেল, পাঞ্জাবি ও অলঙ্কারের দোকানগুলোতে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউবা পরিবার-পরিজন নিয়ে সকালেই হাজির হন রাজধানীর সবচেয়ে বড় এই শপিংমলে। দেশি জুতার ব্র্যান্ড বে এম্পোরিয়ামের বিক্রয়কর্মী মাসুদ জানান, ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, তাদের বিক্রি বাড়ছে। ছুটির দিন বলে দম ফেলার ফুরসত মিলছে না।
রামপুরা থেকে পরিবার নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে ফিউচার পার্কে এসেছেন মনসুর আহমেদ। তিনি বলেন, এখানে সব ব্র্যান্ডের পণ্য একই ছাদের নিচে মিলছে। তাই চেষ্টা করছেন পুরো পরিবারের কেনাকাটা এখানেই শেষ করতে। ঈদের দিনে পছন্দের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে চাই প্রসাধনীও। তাই অলঙ্কার আর কসমেটিকসের দোকানেও ছিল সব বয়েসী নারীর ভিড়। ঈদের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে গহনা কিনতে দেখা গেছে অনেককেই। যমুনা ফিউচার পার্কের মতোই গুলশান ও বনানীর বিপণিবিতানগুলোতে গতকাল ছিল ক্রেতার উপচেপড়া ভিড়।
উত্তরা এলাকা :’রেডিমেড থ্রি পিস, ফ্রক এখন নারীদের পছন্দ। তাই ঈদের বাজারে নন-স্টিচ সালোয়ার-কামিজের দোকানে আর তেমন ক্রেতা আসছেন না। এমন কি শাড়ির দোকানে তেমন ভিড় নেই। এর মধ্যে বৃহস্পতিবারের মধ্যরাত থেকে টানা বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ক্রেতা সমাগমও তেমন হয়নি।’ আক্ষেপ করে কথাগুলো বললেন মাস্কট প্লাজার বস্ত্রমেলা ফ্যাশন হাউসের ম্যানেজার সুমন সাহা। একই সুরে বললেন এম ক্রাফটের ব্যবস্থাপক এম ডি মহিউদ্দিন। তিনি জানান, উত্তরার বিপণিবিতানগুলোতে বেশিরভাগ ক্রেতা আসেন সাভার, গাজীপুর, টঙ্গী থেকে। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে দুপুর পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকজন ক্রেতা এসেছেন। তবে বিকেলের পর থেকে জমে ওঠে কেনাকাটা।
উত্তরা এলাকার ট্রপিক্যাল আলাউদ্দীন টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্স, হিমালয় সেন্টার, বেলী কমপ্লেক্স, কুশল সেন্টার, রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স, রাজউক কর্মচারী কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স, রাজউক রাজীব কসমো শপিং কমপ্লেক্স ও মাস্কট প্লাজায় ক্রেতার ভিড় ছিল না তেমন। বিকেলের পর জমে উঠে কেনাকাটা। তবে তা আশানুরূপ নয় বলেই জানালেন বিক্রেতারা।
জলাবদ্ধতার মধ্যেও উপচেপড়া ভিড় ছিল উত্তরার জসীম উদ্দীন রোডের আড়ংয়ে। এর বিক্রয়কর্মী পপি আক্তার বললেন, রোজা শুরুর পর থেকেই আড়ংয়ে ক্রেতার ভিড় আছে। শুক্রবার হওয়ায় ভিড় আরও বেশি।