অনলাইন ডেস্ক : চারজনই বন্ধু। একই মহল্লায় বসবাস। একই ছাত্র সংগঠনের কর্মী। আচমকা একদিন ‘অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা’ এদের একজনকে ব্যাপক মারধর করে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে যায়। তিন বন্ধুই উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জড়িতরা। জানা গেল, ঘাতক আসলে ওই তিন বন্ধুই। কিন্তু কেন প্রিয় বন্ধুকে হত্যা করলেন তারা?

তিন বন্ধুকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করতেন বংশাল থানা ছাত্রলীগকর্মী ইমরান হোসেন রকি। একপর্যায়ে ‘বেইমানির অপরাধে’ সেই তিন বন্ধুর হাতেই গত ৪ জুন গভীর রাতে রাজধানীর বংশালের নবাব ইউসুফ মার্কেটের গলিতে খুন হন রকি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) দক্ষিণ বিভাগের কোতোয়ালি জোনাল টিম খুনি তিন বন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেনÑ মো. মাহবুবুর রহমান ওরফে সাব্বির, সালমান হোসেন ওরফে বিজয় ও ওমর সেলিম ওরফে সজল। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে খুনের আদ্যোপান্ত জানিয়েছে এই তিনজন। গত ১২ জুন আদালতেও তারা হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। নিহত রকি ও গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনই বংশাল থানা ছাত্রলীগ সভাপতি ইমরান হোসেন জনের অনুসারী।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার তিন যুবক জানিয়েছেন, ঘটনার ছয় মাস আগে কেরানীগঞ্জের ডায়মন্ড মেলামাইন এলাকায় নিজস্ব ফার্ম হাউসে একটি ড্যান্স পার্টির আয়োজন করে এলাকার ছোটভাই ইমরান। সেখানে রকি, সাব্বিরসহ তাদের কয়েকজন বন্ধুকে দাওয়াত দেন তিনি। দাওয়াতের পর দিনগত রাতে ওই ফার্ম হাউসে যান রকি, সাব্বির, বিজয়, সজলসহ কয়েকজন। রাত ১২টার দিকে কয়েকজন যৌনকর্মীসহ ৭-৮ জন তরুণী ও ৮-৯ জন যুবক ফার্ম হাউসে আসেন। সেখানে একসঙ্গে তারা ড্যান্স পার্টিতে অংশ নেন এবং বিয়ার পান করেন। রাত ৩টার দিকে সাব্বির, বিজয়, সজল তিন তরুণীকে নিয়ে দোতলার একটি কক্ষে গিয়ে সহবাস করেন। যে কক্ষটিতে তারা ছিলেন, সেটির চারদিকে ছিল রাউন্ড বারান্দা; একটি গ্লাস উইনডোর লক ছিল ভাঙা। এই ভাঙা জানালা দিয়ে রকি তার মোবাইল ফোন ঢুকিয়ে যৌনকর্মীদের সঙ্গে তার তিন বন্ধুর অশ্লীল দৃশ্য ধারণ করেন। ভোরের দিকে সবাই চলে আসেন ঢাকায়।

ঘটনার ছয় দিন পর রকি ধারণ করা সেই অশ্লীল ভিডিও দেখিয়ে তা প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তিন বন্ধুর কাছে তিন হাজার টাকা চান। ভয়ে তিন বন্ধু রকিকে এক হাজার টাকা দেন। এর পর ওই ভিডিও দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে তিন বন্ধুর কাছে টাকা চাইতে শুরু করেন রকি। খুনিরাও সাধ্যমতো তাকে টাকা দিতেন। গত ৪ জুন এশার নামাজের পর নবাব ইউসুফ মার্কেটে অবস্থিত ছাত্রলীগ কার্যালয়ে ক্যারম খেলার সময় সাব্বিরের সঙ্গে রকির দেখা হয়। এ সময় ঈদের খরচাপাতির কথা বলে সাব্বিরের কাছে ফের চাঁদা চান রকি। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে সাব্বিরের পরিবারকে সেই ভিডিও দেখানোর হুমকি দেন রকি। পারলে দেখা, রাগ হয়ে রকিকে পাল্টা হুমকি দিয়ে সেখান থেকে চলে যান সাব্বির।

ফজরের নামাজের পর বিষয়টি নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে হাতাহাতি, তারপর ধস্তাধস্তি হয় তাদের। রকিকে মারতে মারতে মার্কেটের ভেতরে নিয়ে যান তারা। সেখানে কাঠের টুকরো দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটুনিতে রকি অচেতন হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পানি খাইয়ে তার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করলেও কাজ হয়নি। রকিকে খালি একটি ভ্যানে তুলে প্রথমে তাকে শ্রমজীবী হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রকিকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তার ভাই আরমান হোসেন রানা বাদী হয়ে বংশাল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকতে রকির ঘাতকরা উপস্থিত স্বজনদের বলেন, দুর্বৃত্তরা রকিকে মেরে জনতা মার্কেটের সামনে ফেলে গেছে। তারাই রকিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে এনেছেন। এর পর সুযোগ বুঝে সাব্বির বুড়িগঙ্গার পাড়ে গিয়ে তার কাছে থাকা রকির মোবাইল ফোনটি নদীতে ফেলে দেন। কাপড় পাল্টানোর কথা বলে সটকে পড়েন সজল। হাসপাতালেই ছিলেন বিজয়। গত ১০ জুন বংশাল এলাকা থেকে রকির খুনি তিন বন্ধুকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির কোতোয়ালি জোনাল টিমের এসআই খোরশেদ আলম আমাদের সময়কে বলেন, ইমরান হোসেন রকি হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করেছে গ্রেপ্তার সাব্বির, বিজয় ও সজল। দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হবে।