অনলাইন ডেস্ক : নানা নাটকীয়তা ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ ঐতিহাসিক বৈঠকে বসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন। স্বতন্ত্র ভেন্যু দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে আকাক্সিক্ষত এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় (বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা) সিঙ্গাপুরের সান্তোসা দ্বীপের ক্যাপেলা হোটেলে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পরমাণু নিরস্ত্রীকরণই ট্রাম্প-কিম বৈঠকের মূল ইস্যু হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অর্থনৈতিক গ্যারান্টি ও অবরোধ প্রত্যাহার চায় উত্তর কোরিয়া। বৈঠকের আগে সোমবার দু’দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। একইদিন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি শিয়েন লুংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। খবর বিবিসি ও এএফপির।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পিয়ংইয়ং ‘নতুন একটি সম্পর্ক স্থাপন’ করতে পারে, এমন একটি সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের ঐতিহাসিক বৈঠকের একদিন আগে এমন মনোভাব জানাল উত্তর কোরিয়া। বিবিসি বলছে, এই মন্তব্যে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি উত্তর কোরিয়ার বিদ্বেষমূলক মনোভাব পোষণ করার পর সুর পাল্টানোর লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। সোমবার রোদং সিনমুন সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করতে কিম সিঙ্গাপুরে গেছেন নিশ্চিত করে বলা হয়, ‘নতুন যুগের দাবি মেটাতে আমরা একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলব।’ এতে আরও বলা হয়, ‘কোরীয় উপদ্বীপে একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ইস্যুসহ যেসব সমস্যা সাধারণ উদ্বেগের বিষয় সেগুলোর সমাধানে খোলাখুলি গভীর মতামত বিনিময় করা যেতে পারে।
রোববার দু’দেশের নেতা সিঙ্গাপুরে পৌঁছান। উঠেছেন আলাদা হোটেলে। সিঙ্গাপুরের বিলাসবহুল পাঁচ তারকা সেইন্ট রেজিস হোটেলে উঠেছেন কিম। আর পাঁচ তারকা ডুলেক্স সাংগ্রি-লা হোটেলে থাকছেন ট্রাম্প। দুই হোটেলের মধ্যে দূরত্ব ৭৫০ মিটার। মঙ্গলবার বৈঠক শেষে রাতেই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ট্রাম্প রওনা হবেন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাদের বহু প্রত্যাশিত এই বৈঠকের ব্যাপারে তার মধ্যে ‘শুভ অনুভূতি’ বিরাজ করছে। সোমবার সকালে এক টুইটে তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরের ‘আবহে উত্তেজনা বিরাজ করছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আশা, এই শীর্ষ বৈঠকের মধ্য দিয়ে একটি প্রক্রিয়া শুরু হবে যা শেষ পর্যন্ত কিমের পরমাণু অস্ত্র ত্যাগে গিয়ে ঠেকবে। তবে একে অপরকে বিভিন্ন কটাক্ষের নাম ব্যবহারে পটু দুই নেতা জেদ নমনীয় করবেন কিনা- তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বিশ্লেষকদের। এক সময় ট্রাম্প কিমকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ছোট্ট রকেট মানব’ ও ‘খাটো মোটকু’। বিপরীতে কিম ট্রাম্পকে ডেকেছিলেন ‘ভীত কুকুর’ ও ‘মানসিক ভারসাম্যহীন বুড়ো’ নামে। টুইটার পোস্ট বা রাষ্ট্রীয় বিবৃতিতে তাদের পারস্পরিক বিষোদ্গারের সাম্প্রতিক অতীতও কমবেশি সবার জানা। সেসব অতীতকে পেছনে রেখে সিঙ্গাপুরে মুখোমুখি হচ্ছেন কিম-ট্রাম্প। অনুষ্ঠিতব্য সেই বৈঠকেই এখন নজর রাখছে সারা বিশ্ব।
ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ায় নিরীক্ষাযোগ্য, স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ পারমাণু নিরস্ত্রীকরণ চান। অন্যদিকে কিমের প্রত্যাশা, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আরোপিত করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বন্ধ করবে এবং দেশটিকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেবে। তবে মতপার্থক্য দূর করে তারা কোনো সমঝোতায় আসতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না। সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক পরম্পরায় লিবিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস আর সিরিয়ার বাস্তবতা উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণে অনুৎসাহী করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আর তারা যদি নিরস্ত্রীকরণে রাজিও হয়, এর বিপরীতে ট্রাম্প কিমের প্রত্যাশা পূরণ করবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
শিকাগো ট্রিবিউন জানায়, ১৯৯৪ সালে পরমাণু অস্ত্র গবেষণা বন্ধ করে দেয়ার ওয়াদা করলেও তারা তা মেনে চলেনি। ১৯৯৯ সালেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণা বন্ধ করে দেয়ার চুক্তি করেছিল দেশটি। কিন্তু ২০০৬ সালে সে চুক্তি ভেঙে আবারও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণা শুরু করেছিল। এরপর থেকে দেশটি একদিকে যেমন প্রায় ৬০টি পরমাণু অস্ত্র বানিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ৩ জন প্রেসিডেন্ট- বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বারাক ওবামা উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের আগের আরও ৮ প্রেসিডেন্ট কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হন।
এদিকে দ্বিতীয় বৈঠকের জন্য পিয়ংইয়ংয়ে ট্রাম্পকে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন কিম। জুলাই মাসে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। চলতি মাসের প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্র সফর করে ট্রাম্পের হাতে এ চিঠি তুলেন দেন কিমের ‘ডানহাত’খ্যাত কিম ইয়ং চোল।
‘এক বৈঠকে সব ঠিক হবে না’ : কিম ও ট্রাম্পের বৈঠকের মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান হবে তা ভাবা থেকে দূরে থাকতে বললেন বৈঠকের আয়োজক দেশ সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট লি শিয়েন লং। তিনি এও মনে করিয়ে দিয়েছেন, গত বছরগুলোতে অনেক আলোচনা হয়েছে, চুক্তি হয়েছে যা ভেঙে গেছে। যে অবিশ্বাস ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে, তা এক বৈঠকে শেষ হয়ে যাবে না। সোমবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক শেষে লি বলেন, আপনি একটা বৈঠকের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবেন না। আমরা যেটা আশা করতে পারি তা হল যে, বিষয়টি ইতিবাচক দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি অব্যাহত রাখতে হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা বলতে পারি যে, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে।