অনলাইন ডেস্ক : প্রতিবারই বর্ষবরণের আগে ইলিশ নিয়ে বিতর্ক ওঠে। সে সঙ্গে বাজারে বাড়তে থাকে ইলিশের দাম। কয়েকদিন ধরেই গণমাধ্যমে ইলিশের দাম বাড়ার খবরের সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে বৈশাখে ইলিশ রান্নার নানা রেসিপির খবরও। কিন্তু লোকগবেষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বৈশাখের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের সম্পর্ক নেই। এটা বাণিজ্যিক কারণে আরোপিত সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছেন, বৈশাখ মাসে ইলিশ খাওয়ার মধ্য দিয়ে সারা বছরের ইলিশ উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

এসব কারণে দু’বছর ধরে পহেলা বৈশাখের আগে ‘নববর্ষে ইলিশ নয়’ কথাটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। গত দুই বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবনে বৈশাখী আয়োজনের খাবার তালিকা থেকে ইলিশ বাদ দেন। বৈশাখের প্রথম দিনে ইলিশ-পান্তা বর্জন করেছিল বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও। এবারও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় পহেলা বৈশাখে ইলিশ না খাওয়ার আহ্বান জানিয়ে পেজ খোলা হয়েছে। দু’দশক ধরে নববর্ষে পান্তা-ইলিশের ব্যবসা জেঁকে বসেছে; শতকের ঘর পেরিয়ে ইলিশের দাম এখন ছুঁয়েছে হাজারের ঘর।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে ইলিশ কেনাকাটা বেশ জমজমাট। ক্রেতাদের অভিযোগ, উৎসবকে পুঁজি করে ব্যবসায়ীরা বেশি দামে ইলিশ বিক্রি করছেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ৫০০-৬০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হয় ৭০০-৮০০ টাকা, যা গত মাসে ছিল ৫০০-৬০০ টাকা। ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশের দাম এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা। এক কেজির বেশি ইলিশের দাম দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা। কারওয়ান বাজারের মতো মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মগবাজারসহ অন্যান্য বাজারে প্রায় একই দামে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের হাতের নাগালেই থাকবে সাধের ইলিশ। রাজধানীর সুপার শপগুলোতেও বেড়েছে ইলিশের দাম। মীনা বাজারে এক কেজির ইলিশের দাম দুই হাজার ৯৫ টাকা। ছোট ইলিশের দাম প্রতি পিস ৫৫০ টাকা। স্বপ্ন সুপার শপে ছোট সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৪৯০ টাকা দরে।

কারওয়ান বাজারের ইলিশ ব্যবসায়ী সুমন মিয়া বলেন, ইলিশের চাহিদা বেড়েছে, তাই পাইকারি বাজারে কিছুটা দামও বেড়েছে।

ইকো মৎস্য প্রকল্পের পরিচালক ও মৎস্য সম্পদ গবেষক অধ্যাপক আবদুল ওয়াহাব সমকালকে বলেন, এখন যে দামে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে তা মূলত উচ্চ ও উচ্চ মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য। কিন্তু নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ কিনতে পারছেন না। সুতরাং, সারা বছর যদি ইলিশ সব শ্রেণির মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে হয়, তাহলে বৈশাখে ইলিশ খাওয়া বন্ধ করতে হবে। পান্তার সঙ্গে অন্য কোনো মাছ বা ভর্তা খাওয়া যেতে পারে। আর এর সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতিরও কোনো সম্পর্ক নেই।

লোকগবেষক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, বৈশাখ প্রকৃত অর্থে খরার মাস। এ সময় কোনো ফসল ওঠে না। সাধারণ কৃষকের পক্ষে ইলিশ কিনে খাওয়ার মতো টাকাও থাকে না। ফলে পান্তার সঙ্গে ইলিশের যোগ নেই। আসলে গ্রামবাংলায় পহেলা বৈশাখের আয়োজনে থাকত আগের দিন ভিজিয়ে রাখা চাল। যে চালের পানি কৃষক খেতেন এবং মঙ্গলের জন্য কিষানির শরীরে ছিটিয়ে দিতেন। তারা পান্তা খেতেন কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ, শুঁটকি ভর্তা, বেগুন ভর্তা এসব দিয়ে।

দীর্ঘদিন ধরে পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশের বিরুদ্ধে কথা বলছেন কবি আসাদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ইলিশ আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। তবে বর্ষবরণে পান্তা-ইলিশ কোনোভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির অংশ নয়। এ সময়টা ইলিশ সংরক্ষণের সময়, ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে। এখন ডিমভর্তি জাটকা ইলিশ ধরা হচ্ছে। একটি ডিম খেয়ে ফেলা মানে বহু মাছ খেয়ে ফেলা।