বিগত সময়ে পানি কম এবং করোনার প্রভাবে অনেক পর্যটক ও দর্শনার্থী না আসলেও এ বছর হাওরের বুকে জলের গ্রাম দেখতে ঢল নামছে মানুষের।
বর্ষায় নাও হেমন্তে পাও’ অর্থাৎ অন্তেহরী গ্রামে বর্ষায় যাতায়াতের প্রধান ভরসা নৌকা। শীত মৌসুমে পায়ে হেঁটে পথ চলতে হয়।
মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার কাউয়াদিঘি হাওর। এই হাওরের পশ্চিম প্রান্তে ফতেপুর ইউপির এক নিবৃত পল্লী- অন্তেহরি। জলের গ্রাম অন্তেহরি ভ্রমণে পাবেন প্রকৃতির মমতা মাখা ছোঁয়া। নামে রূপে গ্রামখানি প্রশান্তির আদর্শ স্থান।
বর্ষার এই সময়টায় গ্রামের বাড়িগুলো দেখতে যেমন মনে হয় পানির ওপর ভেসে আছে। শীত মৌসুমে তার বিপরীত। শীতে এক একটি বাড়ি মনে হবে টিলার ওপর তৈরি। হাওরের বাড়িঘর খুব সহজে পানিতে নিমজ্জিত হয়, ফলে বাড়িগুলো অনেক উঁচুতে নির্মাণ করতে হয়। প্রতিটি বাড়ির চারিদিকে দেখা মিলবে বিভিন্ন জাতের গাছ গাছালি। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে হিজল-তমাল- করচ, এইগাছগুলো বর্ষায় হাওরের ঢেউ থেকে বাড়িগুলোকে রক্ষা করে, এবং সারাবছর দেশিয় পাখিদের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল।
কুমিল্লা থেকে ঘুরতে আসা নিপা দে জানান, এই জলের গ্রামের সৌন্দর্যের অনেক বর্ণনা শুনেছি। এই প্রথম দেখতে আসলাম, এসে আমি মুগ্ধ, মনে হয় হারিয়ে যাই প্রকৃতির এই নান্দনিক উপস্থাপন দেখে।
সানি আহমদ জানান, এখানকার সবকিছু আমার ভালো লাগে। সুবিশাল হাওর, হাওর তীরের গ্রাম, নৌকায় মানুষের যাতায়াত, হাওরে মাছ ধরার দৃশ্য। হাওর ও হাওর পাড়ের বৈচিত্র্যময় জীবন যাপন একদিকে কষ্টের হলেও অন্যদিকে আনন্দেরও। আমি মুগ্ধ হই, এজন্য এখানে ফিরে আসি বারবার।
হাওর পাড়ের বাসিন্দা পিকলু দাশ বলেন, এই গ্রামটির অধিকাংশ মানুষই কৃষিজীবী। হাওরে সাধারণত একটি ফসল হয় বোরো ফসল। বোরো ফসলের ওপর নির্ভর করে সারা বছর চলতে হয়। খাদ্য শিক্ষা চিকিৎসাসহ সব মৌলিক চাহিদা ও সামাজিক অনুষ্ঠানাধী এই ফসলের আয় থেকে চলে। পাশাপাশি যে সময় যে কাজ পান সেগুলোও করে জীবন ধারণ করেন। কেউ কেউ বর্ষা মৌসুমে হাওরে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে চাহিদা পূরণ করেন।
২০১৮ সালে এই গ্রামটিকে সরকারিভাবে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণা করা হয়, নামকরণ করা হয় ‘জলের গ্রাম অন্তেহরী’ সারাবছর পর্যটকরা নির্বিঘ্নে আসার লক্ষ্যে নানাবিধ উদ্যোগ নিয়ে কাজ চলছে। সরকারি উদ্যোগে কিছু উন্নয়ন হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অবকাঠামো গত উন্নয়নের পরিকল্পনা চলছে। এই গ্রামকে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণা করায় কাজের সুযোগ পাবেন বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল গ্রামের অনেক দরিদ্র মানুষ, পাশাপাশি বাড়বে তাদের জীবনযাত্রার মান।
বর্ষায় হাওরের বুকে থাকে থইথই জল কিংবা জলের ওপর একটু করো সবুজের হাতছানি। শাপলা-শালুক অথবা নাম না জানা বাহারী বর্ণের ফুল যেন জানান দেয়- স্বাগতম হে অতিথি।
রাজনগরের ফতেহপুর ইউপির গ্রাম- অন্তেহরি। বস্তুত কাউয়াদিঘি হাওরকে কেন্দ্র করে এখানে লোকবসতী গড়ে উঠে। গ্রামটি বৈচিত্রপূর্ণ রূপ ধারণ করে যখন হাওর পানিতে পরিপুর্ণ থাকে। আর তখনই অন্তেহরি ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ালে এই জলের গ্রামের নান্দনিক রূপ চোখে ধরা পড়বে।
ফতেপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নকুল চন্দ্র দাশ জানান, এখানে ছোট ছোট নৌকার পাশাপাশি উন্নতমানের অনেকগুলো নৌকা আছে। এখানে নানাধরণের শাপলা ফুটে, বর্তমানে কচুরিপানা শাপলা ফুটতে সমস্যা করে, এজন্য কচুরিপানা অপসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এই পর্যটন কেন্দ্রে পরিবেশ প্রকৃতি ঠিক রেখে উন্নয়ন ও নান্দনিক করা হবে।
মৌলভীবাজার শহর থেকে অন্তেহরি গ্রামের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। বসবাস প্রায় ৬ হাজার মানুষের। ৪-৫ বছর আগেও বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে শহরের সঙ্গে গ্রামটির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকতো। বর্তমানে সড়ক পথের বেশ উন্নতি হয়েছে। তাই গাড়িতে করে সহজে যেতে পারেন অন্তেহরি।
মৌলভীবাজার শহরের চাঁদনীঘাট ব্রিজ সংলগ্ন জগতপুর স্ট্যান্ড থেকে ৪০ টাকা ভাড়ায় সিএনজি চালিত অটোরিকশায় যেতে পারেন, কিংবা রিজার্ভ গাড়ি নিয়েও সোজা চলে যেতে পারেন কাদিপুর বাজারে। সেখান গিয়ে ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে ভাড়া করা নৌকা নিয়ে ঘুরে দেখতে পারবেন কাদিপুর গ্রাম, অন্তেহরী গ্রাম এবং পুরো কাওয়াদীঘী হাওর ব্যাষ্টিত সবুজের এ শীতল রাজ্য।