গত ২৪ মার্চ ২০-দলীয় জোটের বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তির আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে কোনো আলোচনা নয় বলে সিদ্ধান্ত হয়। ছবি: বিএনপির সৌজন্যেগত ২৪ মার্চ ২০-দলীয় জোটের বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তির আগে আসন ভাগাভাগি নিয়ে কোনো আলোচনা নয় বলে সিদ্ধান্ত হয়। ছবি: বিএনপির সৌজন্যেদুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের সাজা খাটতে দুই মাস ধরে কারাগারে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আছেন বিদেশে। দলীয় চেয়ারপারসনকে মুক্ত করতে আইনি লড়াই ও রাজপথে আন্দোলন করছে বিএনপি। তবে খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনকে পরোয়া করছে না সরকার। আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন পেতেও সময় লাগছে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বসে নেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিকেরা। তারাও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু কর্মসূচি পালন করছে। তবে বিএনপির ‘খারাপ’ সময়ে বেঁকে বসেছে ২০-দলীয় জোটের শরিকেরা। ২০-দলীয় জোট গঠনের প্রায় ছয় বছর পর এখন জোটের কোনো কোনো শরিক দল মনে করছে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। আর তাই এখনই বিএনপির কাছ থেকে সব হিসাব-নিকাশ বুঝে নিতে চায় তারা। আগামী নির্বাচনে কোন শরিককে কতটি আসন ছাড় দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে এখনই বিএনপির কাছ থেকে সুস্পষ্ট আশ্বাস চাচ্ছে শরিকেরা।

হঠাৎ শরিকদের এমন আচরণকে ভালোভাবে দেখছেন না বিএনপির নেতারা। যদিও প্রকাশ্যে বিএনপির নেতারা বলছেন জোটে কোনো সমস্যা নেই। তবে দলটির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বললেন, এখনই আসন ভাগাভাগির দাবিতে কিছুটা বিস্মিত হয়েছে। তবে রাজনীতিতে এটা অস্বাভাবিক নয়। জোটের শরিক দলগুলো ‘সুযোগ নিচ্ছে’। এর পেছনে সরকারের মদদও থাকে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে ২০-দলের নির্বাচনে না যাওয়া, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জোট একমত হয়েছে। জোটের জন্য বিএনপির একজনকে সমন্বয়কারী করা হয়েছে। তাই মনে করি না যে জোট ভাঙার মতো অবস্থা হয়নি। হয়তো তারা তাদের হিসাব-নিকাশ বুঝে নিতে বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে।

জানতে চাইলে ২০-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম প্রথম আলোকে বলেন, ২০-দল ঠিকই থাকছে। বিভিন্ন সময়ে কেউ কেউ হয়তো চলে গেছে। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ২০-দলের ঐক্য অটুট আছে। এটা থাকবে। তিনি বলেন, জোটের বৈঠকে সর্বসম্মতিতে করণীয় ঠিক করা হয়। এগুলো জোটের দলগুলো মেনে চলে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদেশে। সে কারণে জোটে বর্তমানে ক্রান্তিকাল, ভঙ্গুর অবস্থা চলছে। এ থেকে উত্তরণে বিএনপিকে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা দরকার বলে তিনি মনে করেন।

গত মঙ্গলবার রাজধানীতে ২০ দলের অন্যতম শরিক এলডিপির ঢাকা মহানগর (উত্তর) শাখার সম্মেলনে জোটের শরিক নেতারা আসন ভাগাভাগির বিষয়টি নিয়ে এখনই ফয়সালা করার দাবি তোলেন। ওই সম্মেলনে জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা উপস্থিত থাকলেও মূল দল বিএনপির কেউ উপস্থিত ছিলেন না। বিএনপি বিষয়টি নিয়ে জোরালো কোনো মন্তব্য না করলেও দলটির নেতারা জোটের শরিকদের অবস্থানকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে।

জোট শরিকদের এমন আচরণের সূত্রপাত আরও আগে। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর গত ২ মার্চ জোট শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) একটি প্রার্থী তালিকা গণমাধ্যমের হাতে আসে। এ ছাড়া জোটের নিবন্ধিত দলগুলোও নিজেদের দলীয় প্রার্থী নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা করেন; যা গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়।

এরপর গত ২৪ মার্চ জোটের বৈঠক ডাকা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে এটি ছিল দ্বিতীয় বৈঠক। ওই বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তির আগে আসন বণ্টন নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা না করার সিদ্ধান্ত হয়। কোনো কোনো দলের আসন নিয়ে হিসাব-নিকাশ নিয়ে ওই বৈঠকের জোটের নেতাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘটনাও ঘটে।

আসন ভাগাভাগি নিয়ে শরিকদের দাবির সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ ঘটে ৩ এপ্রিল মঙ্গলবার। এলডিপির ঢাকা মহানগর সম্মেলনে বিএনপির প্রতি ‘কঠোর বার্তা’ ছুড়ে দেন শরিকেরা। বিএনপির দুজন দায়িত্বশীল নেতা বলছেন, তাঁরা খোঁজ নিয়েছেন, সম্মেলনে জোটের দলগুলো যে অবস্থান তুলে ধরেছে, তা ছিল পূর্বপরিকল্পিত।

জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসনের মুক্তি ছাড়া এখন অন্য কোনো বিষয় নিয়ে বিএনপি ও জোট কাজ করছে না। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির পর নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ২০-দল নির্বাচনে যাবে। তখন আসন ভাগাভাগির বিষয়টি আসবে।

এলডিপির সম্মেলনে দলটি বিএনপিকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা এপ্রিলের মধ্যে আসন ভাগাভাগির বিষয়ে সমঝোতা চায়। তা না হলে ৩০০ আসনে ৬০০ প্রার্থী দেওয়ার ক্ষমতা রাখে এলডিপি। দলটির সাধারণ সম্পাদক রেদওয়ান আহমেদ সেখানে বলেন, ‘যারা যোগ্য, তাদের কাজ করতে বলেছি। আশা করি বিএনপি, এলডিপি সভাপতিসহ নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে যোগ্য ব্যক্তিদের মনোনয়ন নিশ্চিত করবে।’ দশম সংসদ নির্বাচনে এলডিপি অংশ নিলে দশটি আসন, দুজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দেওয়ার প্রস্তাব আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

শরিকদের এমন বক্তব্য জোটে ভাঙনের ইঙ্গিত কি না, জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, শরিকদের চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে। কিন্তু এর মানে এই না যে জোটে ভাঙন হবে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বিএনপি ও জোট ঐক্যবদ্ধভাবেই কাজ করছে।

গতকাল বুধবার বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, জোটে কোনো সমস্যা নেই। বিএনপি জোটবদ্ধভাবেই নির্বাচনে অংশ নেবে।