ছবিঃ অন্তর্জাল (প্রতীকী)

তখনও মারেক মারেক বরাবরের মতো সুদর্শন ছিল । তার গায়ের রঙ ছিল ফর্সা, কাঁধ পর্যন্ত দীর্ঘ চুল ছিল এবং সুশ্রী বালিকার মতো চেহারা ছিল । তার চোখ ছিল খুবই ফ্যাকাশে, যেন অন্ধকার ভূগর্ভস্থ ঘরে সময় কাটানোর জন্য তার চোখ দুটি আসল রঙ হারিয়ে ফেলেছে, অথবা সেই নীল কাপড়ে মোড়ানো গ্রন্থগুলো পড়ার জন্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ।

কিন্তু মেয়েরা তাকে ভয় পেত । একবার কোনো এক ডিস্কো চলার সময় সে এক মেয়েকে নিয়ে বাইরে গিয়েছিল । তারপর সে তাকে বড় এক ঝোপের মধ্যে টেনে নিয়ে যায় এবং তার ব্লাউজ ছিঁড়ে ফেলে । তবে খারাপ কিছু হয়নি, কেননা মেয়েটি চিৎকার করেছিল এবং তার চিৎকার শুনে অন্য ছেলেরা দৌঁড়ে এসে তাকে রক্ষা করেছিল । ছেলেগুলো মারেক মারেককে বেদম মেরেছিল । কিন্তু মেয়েটি মারেক মারেককে পছন্দ করত । মেয়েটির মনে হয়েছিল হয়ত মারেক মারেক জানত না কিভাবে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে হয় । অন্য এক সময় মারেক মারেক মাতাল ছিল এবং একজনকে ছুরি মেরেছিল । কেননা লোকটি তার পরিচিত এক মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেছিল, যেন মেয়েটির ওপর তার একচেটিয়া অধিকার ছিল । ঘটনার পরে সে বাড়িতে ফিরে গিয়ে কান্নাকাটি করে ।

মারেক মারেক সুরা পান করা অব্যহত রাখে । পাহাড়ের ওপর দিয়ে চলার সময় তার পা নিজেদের পথ তৈরি করার অনুভূতি সে পছন্দ করে । তখন তার অন্তরের সমস্ত বেদনা স্থবির হয়ে থাকত, যেন কোনো সুইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং হঠাৎ করে অন্ধকার এসে সবকিছু ঢেকে দিয়েছে । সে তুমুল, অপ্রীতিকর ও দীর্ঘস্থায়ী শব্দ এবং ধূমপানের ধোঁয়ার মধ্যে লিডো পানশালায় বসে থাকতে পছন্দ করত । তারপর হঠাৎ করে, ঈশ্বরই জানেন কীভাবে, একসময় নিজেকে তিসি ক্ষেতে ফুলের মাঝে খুঁজে পেত । সেখানে সে সকাল পর্যন্ত, এমনকি আমৃত্যু, শুয়ে থাকতে চাইত । অথবা জুবিলাটকা২ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে পান করতে চাইত । তারপর হঠাৎ করে সে রক্তাক্ত মুখ এবং ভাঙা দাঁত নিয়ে মহাসড়কের পাশ দিয়ে গ্রামের দিকে এমন অবস্থায় ফিরে যেতে চাইত, যখন তার পরিস্থিতি শুধুমাত্র আংশিকভাবে জীবিত, আংশিকভাবে সচেতন থাকত এবং ধীরে ধীরে আলতো করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হত । সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে তার মাথা ব্যথা অনুভব করত এবং সে অন্তত জানত যে, কী তাকে কষ্ট দিচ্ছে—তৃষ্ণা অনুভব করা এবং তা নিবারণ করতে সক্ষম হওয়া ।

পুলিশ এসে মারেক মারেককে শান্ত করার জন্য নিয়ে যায় এবং পরবর্তী সময়ে তাকে হাজতে রাখে । সেখানে পান করার মতো তার কাছে কিছুই ছিল না ।

তার মাথার ভেতর প্রচন্ড ব্যথা ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ে এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় তার মনে পড়ে যে, শুরুতেই সে একবার নিচে পড়ে গিয়েছিল । তারপর ওপরে উঠেছিল এবং অবশেষে নিচে পড়ে আছে । তার মনে পড়ে নিচের দিকে পড়ে যাওয়ার গতি এবং আতংক—আতংকের চেয়েও অধিক ভয়ংকর—যার কোনো প্রতিশব্দ নেই । মারেক মারেকের স্থূলবুদ্ধি শরীর নির্বিকারভাবে সমস্ত আতংক মেনে নেয় এবং সে কাঁপতে শুরু করে । তার হৃদপিন্ড ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল । কিন্তু তার শরীর জানত না যে, তার ওপর কী ভর করেছে—কেবল একটি অমর আত্মাই এধরনের আতংক সহ্য করতে পারে । সেই আতংকের জন্য তার শরীর হিম হয়ে গিয়েছিল এবং নিজের মধ্যে সঙ্কুচিত হয়েছিল । এছাড়া তার ছোট্ট কোষের দেওয়ালের গায়ে আঘাত করেছিল এবং তার মুখ ফেনায় ভরে গিয়েছিল । ‘গোল্লায় যাও, মারেক!’ হাজতের প্রহরীরা চিৎকার করে বলল । তারা তাকে মাটিতে ফেলে দেয় এবং ইঞ্জেকশন পুশ করে । 

অবশেষে মারেক মারেকের স্থান হয়েছিল মাদক নিরাময় কেন্দ্রের হাসপাতালে । সেখানে বিবর্ণ পাজামা পরা অন্যদের সঙ্গে সে প্রশস্ত বারান্দায় ঘোরাঘুরি এবং ঘূর্ণায়মান সিঁড়ি দিয়ে উঠা-নামা করত । সে ঔষধের জন্য সুবোধ বালকের মতো লাইনে দাঁড়াত এবং তা পেলে সান্ধ্যভোজের মতো গিলে ফেলত । যখন সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল, তখন প্রথমবারের মতো তার মনে হয়েছিল এই কলুষিত দেশ থেকে, এই লাল-ধূসর মৃত্তিকা থেকে, এই অত্যধিক উত্তপ্ত হাসপাতাল থেকে, এই বিবর্ণ পায়জামা থেকে, এই মাদকাসক্ত শরীর থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মারা যাওয়ার চিন্তা । তারপর থেকে সে মৃত্যুর একটি উপায় উদ্ভাবনের জন্য প্রতিটি চিন্তাকে উৎসর্গ করেছিল । 

এক রাতে মারেক মারেক গোসলের সময় তার হাতের শিরা কাটে । তার হাতের সাদা চামড়া ভাগ হয়ে যায় এবং ভেতরের অংশটি বেরিয়ে আসে । তা ছিল সদ্য জবাই করা গরুর মাংসের মতো লাল এবং থলথলে । জ্ঞান হারানোর আগে সে অবাক হয়েছিল । কারণ, ঈশ্বর জানেন কেন, সে ভেবেছিল যে, সে সেখানে আলোর রশ্মি দেখেছে ।

স্বাভাবিকভাবেই মারেক মারেককে নিঃসঙ্গ করে আটকে রাখা হয়েছিল । অনাকাঙ্খিত এক ঘটনার পরে হাসপাতালে তার থাকার মেয়াদ বেড়ে গিয়েছিল । সে পুরো শীতকাল সেখানেই কাটিয়েছিল । অবশেষে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরে সে আবিষ্কার করে যে, তার বাবা-মা শহরে তাদের মেয়ের বাড়িতে চলে গেছে এবং তাকে একা থাকতে হবে । বাবা-মা তার জন্য ঘোড়া রেখে যান এবং সে বন থেকে কাঠ আনার জন্য ঘোড়াটি ব্যবহার করে । সেসব কাঠ সে বাজারে বিক্রি করে । তার কাছে কাঠ বিক্রির টাকা ছিল, তাই সে আবার মদ্যপান শুরু করে ।

মারেক মারেকের অভ্যন্তরে একটি পাখি ছিল—এমনটাই সে অনুভব করত । কিন্তু অন্তরের সেই হতভাগা পাখিটি ছিল অদ্ভূত, অপরিপক্ক, নামহীন এবং তার নিজের চেয়ে বেশি ছিল না । সে এমন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, যা সে বুঝত না এবং বিভিন্ন বিষয়ে ভয় পেত, যেমন কোনো উত্তর ছাড়াই প্রশ্ন করা এবং যাদের উপস্থিতিতে সে সর্বদা অস্বস্তি বোধ করত । একসময় সে হাঁটু গেড়ে বসার তাগিদ অনুভব করে এবং হতাশ হয়ে আচমকা প্রার্থনা শুরু করে । কিছু চাওয়ার জন্য সে প্রার্থনা শুরু করেনি, বরং এই আশায় অনবরত কথা বলতে শুরু করে যে, কেউ হয়তো তার কথা শুনছে । (চলবে)

প্রথম পর্ব : https://www.daily-bangladesh.com/art-and-culture/326640