কি নির্মম, অমানবিক? লোমহর্ষক? বীভৎস? কোন বিশেষণে বিশেষায়িত করবেন এই ঘটনাকে? বাবা-মা দুজনেই চাকরি করেন। ছোট্ট শিশুটিকে রেখে যান বাসায় গৃহকর্মী শাহিদা ওরফে তাজনারার (৪৫) কাছে। বাংলাদেশের বহু পরিবার বর্তমানে এভাবেই সংসার জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া তাদের কিছু করারও নেই। কিন্তু যে গৃহকর্মীর কাছে নিজের শিশুকে রেখে যাচ্ছেন, তার কাছে আপনার শিশু কতটা নিরাপদ? রাজধানী ঢাকার সাম্প্রতিক একটি ঘটনার ভিডিও দেখে শিউরে উঠতে হচ্ছে! দুই বছর একটি শিশুকে ৪৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী শাহিদার ভয়াবহ নির্যাতনের দৃশ্য ধরা পড়েছে সিসি ক্যামেরায়।
শিশুটির বাবা আল আমিন সরকার বলেন, ‘আমি একজন অসহায় বাবা, যাকে দেখতে হয়েছে ২ বছরের সন্তানকে বীভৎস মারের দৃশ্য! এই নির্যাতনের দৃশ্য দেখেও কিছু করতে না পারার আক্ষেপে পুড়ছি আমি। দেখা ছাড়া কিছু করার ছিল না আমার!’
রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকার বাসিন্দা ইঞ্জিনিয়ার মো. আল আমিন সরকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। শিশুটির মা লুৎফুন্নাহার উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। এই দম্পতির একমাত্র শিশু আবদুল্লাহ আবতাই আয়াতের বয়স মাত্র দুই বছর। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করায় আয়াত থাকত বাসায় গৃহকর্মী শাহিদার কাছে। কিছুদিন ধরেই সন্তানকে দেখে এমনই কিছু একটা আশংকা হয়েছিল বাবার। যে কারণে তিনি দ্রুত নিজের বাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেন। আইপি ক্যামেরায় ধারণকৃত ফুটেজ তিনি নিজের স্মার্টফোনেই লাইভ দেখতে পারতেন। যে কারণে নিজের সন্তান চোখে চোখেই থাকত।
অবশেষে এল ১৪ নভেম্বর ২০১৯! অফিসে বসে ভয়ংকর এক দৃশ্য চোখে পড়ল আল আমিন সরকারের। সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে গৃহকর্মী দ্বারা সন্তানকে নির্যাতনের দৃশ্য! বাথরুম থেকে ঘরের ভেতর ছুড়ে ফেলে দিয়ে ওইটুকু শিশুকে একের পর এক লাথি মারতে থাকে সেই গৃহকর্মী শাহিদা! অতঃপর ক্রন্দনরত শিশুকে সেভাবে ফেলে দিয়েই আবারও নিজের কাজে মন দেয় সে। প্রযুক্তির কল্যাণে অফিসে বসে কলিজার টুকরা সন্তানের ওপর এই ভয়াবহ নির্যাতনের দৃশ্য দেখে চিৎকার করা ছাড়া বাবার তখন কীইবা করার ছিল! সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ছুটেন বাসার দিকে। গৃহকর্মীর হাত থেকে উদ্ধার করেন নিজের সন্তানকে।
এই ঘটনায় গত ১৫ নভেম্বর রাত সোয়া ৯টার দিকে শাহজাহানপুর থানায় শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০১৩ (সংশোধিত ২০১৮) এর ৭০ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন আল আমিন সরকার। অভিযুক্ত গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এ বিষয়ে শাহজাহানপুর থানার ওসি মো. শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই বাসার স্বামী স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী হওয়াতে বাসায় থাকতেন না। তাদের দুবছরের শিশুটি বাসায় গৃহকর্মীর কাছে থাকতো। এই সুযোগে গৃহকর্মী শিশুটিকে মারধর করতো। বৃহস্পতিবার সিসিটিভি ফুটেজে মারধরের চিত্র পাওয়ার পর শুক্রবার পরিবার মামলা করে। সেদিনই গৃহকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
শিশুটির বাবা আল আমিন সরকার আরও বলেন, ‘বাসায় ফিরে আমার সন্তানকে জড়িয়ে ধরেছি, কোলে তুলে নিয়েছি, অনেক আদর করেছি। কিন্তু অন্য দিনের মতো চিৎকার করে ‘বাবা’ ‘বাবা’ করে নাই। বাচ্চাটা আমার মার আর লাথির ভয়ে এতটাই ভীত হয়ে পড়েছিল যে, ‘বাবা’ বলতে যেন ভুলেই গিয়েছিল! আমি এই ঘটনার বিচার চাই। সেইসঙ্গে আমাদের মতো দম্পতিরা যেন সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন হয়। সবাই দোয়া করবেন আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটার জন্য।’
দেখুন সেই ভিডিও:
https://youtu.be/WoCcJn9sEPI