কিছুটা অবাস্তব শোনালেও আষাঢ় ঘিরে বদলে যায় বাঙালির জীবনযাত্রা। এ যে জলের দেশ, নদী, খাল আর বিলের দেশ। ভরা বর্ষায় মাঠঘাট চরাচর যখন ভেসে যেত বানের জলে, তখন বদলে যেত আবহমানকালের বাঙালি জীবনযাপনও। কোনোরকমে রান্না-খাওয়া সেরেই সবার আশ্রয় হয় ঘরে।
আষাঢ় এলেই প্রকৃতিতে আসে রূপ বদলের পালা। তেমনি বৃষ্টি প্রভাবিত করে বাঙালির জীবনযাত্রাকেও। সেসব কথার স্মৃতিচারণ যেন বেশ মধুর। আর পালাবদলের খতিয়ানটাও অনেকটা দীর্ঘ।
গ্রামীণ নারীরা ব্যস্ত হয় সৃজনশীল কাজে
আষাঢ়ের সময় গ্রামীণ নারীরা ব্যস্ত হয়ে ওঠে নানারকম সৃজনশীল কাজে। নানারকম সূচিকর্ম, কারুকার্য ইত্যাদিতে সময় কাটান তারা। নকশি কাঁথা সেলাই, পাটি বোনা, মাদুর তৈরি, পাখা তৈরিসহ নানা শিল্পকর্মের কাজে সময় কাটায় তারা। ঘরের বাইরে তেমন কাজ না থাকায় এই প্রবণতা বাড়ে নারীদের।
বৃষ্টির সঙ্গে আসে খিচুরির প্রথা
বাঙালি জীবনে এখনো আষাঢ় আসে রোমান্টিক বার্তা নিয়েই। তাইতো বৃষ্টির দেখা পেতে না পেতেই ঘরে ঘরে চুলায় বসে খিচুড়ির হাড়ি। বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি আর সামর্থ্য অনুযায়ী আচার, ভর্তা, ডিম বা মাছ-মাংসের নানা আয়োজন করে বাঙালিরা। তাই বলা যায়, খিচুড়িও যেন বৃষ্টিযাপনের অংশ।
ঠিক তেমনি বর্ষার আরেক উপাদেয় খাবার গরম গরম চায়ের সঙ্গে ভাজাপোড়া। বৃষ্টি বিকেলে চায়ের আড্ডায় পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যেন অন্যরকম উৎসবে মেতে উঠি আমরা।
বর্ষাই যেন নৌকা বাইচের সঠিক সময়
নৌকা বাইচ হলো জলকেন্দ্রিক একটি খেলা। এটি মূলত নৌকার গতিময়তা প্রকাশের একটি প্রতিযোগিতা। নৌকা বাইচ যেন এক আনন্দের হাট বসানো গ্রামীণ উৎসব। বাঙালি সংস্কৃতির একটি আদি ঐতিহ্যও। সেই আদি থেকে বর্ষাকালে জমে উঠত নৌকা বাইচ। নদীতে বেশি পানি থাকায় এ মৌসুমেই জমে এই উৎসব।
জমে আষাঢ়ে গল্পও
বৃষ্টির সঙ্গে আলস্য আর গল্পগুজবের যেন সুপ্রাচীন সম্পর্ক। প্রাচীন বাংলায় যেমন মাঠ-ঘাট পেরিয়ে সুদূর গ্রাম থেকে ভেসে আসে বাঁশির সুর অথবা ভাটিয়ালি-কীর্তনের কথা, তেমনি ঘরে বসে গল্পগুজবেও কাটে সময়।
কতো আর জানা গল্প বলা যায়, কাহিনীর আগামাথা ছাড়িয়ে গল্পের গরু হয়তো গাছেই উঠে পড়ে। এভাবেই হয়তো আষাঢ়ে গল্পের নামকরণ। এখনও বৃষ্টির দিনে সন্ধ্যার পর ভুত-প্রেত আর রূপকথার গল্পে মেতে ওঠা বাঙালির চিরায়ত অভ্যাস। যদিও প্রযুক্তির কল্যাণে এখন মুভি দেখা, গান শোনা, রেডিও শোনা ইত্যাদি নানা নতুন নতুন অভ্যাস যুক্ত হয়েছে, আষাঢ়ে জীবনযাপনের তালিকায়।
আষাঢ় পাল্টে দেয় প্রকৃতিও
বর্ষা মানেই যেন সুবাসিত চারপাশ। নানাবর্ণ আর রূপের মাধুরী মিশিয়ে প্রকৃতিকে ফুলের সৌরভে ভরিয়ে তোলে বর্ষারাণী। বাদল দিনে দেখা দেয় কদমফুল। কদম ছাড়াও এসময়ে দেখে মেলে কেয়া, জুঁই, চালতা ফুল, কামিনী, বেলি ও বকুল, গন্ধরাজ, রঙ্গন, রক্তজবা, টগর, শ্বেতকাঞ্চন, স্পাইডার লিলি, দোলনচাঁপা, শাপলা, সন্ধ্যামালতি, কামিনী, দোপাটি ও অলকানন্দার মতো ফুল।
আবার বর্ষা মানেই জল। আর জল মানেই জলজ ফুলের মেলা। তাই বর্ষা আসতে না আসতেই জলের গায়ে মেলা বসে শাপলা-শালুক-পদ্ম। আবার অবহেলিত হলেও এসময়ে কচুরিপানা ফুলও বর্ষাঋতুর সৌন্দর্যে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
আষাঢ় সঞ্চার ঘটায় কৃষি
আষাঢ়ে খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, ডোবা ধীরে ধীরে ভরে ওঠে নতুন পানির জোয়ারে। কৃষকের মনে দোলা দেয় এমন দিনে কী কী কাজ করা যায়। তাইতো কৃষকরা মাঠে নামে নতুন উদ্যমে। ধান, পাট, শাকসবজি জন্মানোর পরিকল্পনাগুলো কৃষকের মনে নতুন আশার সঞ্চার ঘটায়।
নদীতে আসে পানি, আসে মাছ
এ সময় নদীতে পানি বাড়ে। জেলেদের জালে মাছও ওঠে বেশি। গ্রামাঞ্চলে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায়। তা হলো পুকুর, খাল-বিল থেকে কই মাছ মাটিতে উঠে আসে। জীবন্ত কই মাছ মাটির ওপর লাফালাফি করে। এই ঘটনাকে গ্রামের মানুষ বলে ‘মাছ উজানো’। শুধু কই মাছই নয়, পুকুর বা জলাশয়ের পানিতে স্রোতের সঙ্গে শিং, মাগুর মাছও বৃষ্টির সময় স্রোতের দিকে এবং পুকুর পাড়ে উঠে আসে।
আবার আষাঢ়ের অপ্রসন্ন অভিমানী দৃষ্টিতে ঘরে ঘরে অন্তহীন সংহার রূপে মানুষ আতঙ্কিত হয়। এ যেন এক চোখে অশ্রু, অন্য চোখে হাসি। তেমনই কিছু রূপ….
ফুটপাতবাসীর দুঃখের কারণ
আষাঢ় একদিকে যেমন গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে আশীর্বাদ, অন্যদিকে দরিদ্র গ্রামবাসী বা অনাহারী ফুটপাতবাসীর কাছে দুঃখেরও একটি কারণ হয়ে ওঠে।
ফুটপাত ছাড়া যাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, বৃষ্টিতে রাস্তা ডুবে বিপাকে পড়ে এরা। রাস্তার জলের মধ্যেই তাদের বসবাস করতে হয়।
ফুটপাতবাসীদের থাকার জায়গাটুকু কেড়ে নেয় বৃষ্টি। রাস্তায় পানি, বিছানায় পানি, কোনোরকমে পলিথিনের নিচে জড়ো হায়ে বসে থাকেন তারা। পানিতে ডোবা রাস্তার ভিতরেই চলে তাদের খাবার খাওয়ার কাজ।
রাস্তায় জমে পানি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলে যেতে বর্ষার ঝাপটায় ভিজে-নেয়ে একাকার হতে হয়। পাকা রাস্তায়ও পানি জমে মোটরগাড়ি আটকে যাওয়াও এই সময়ের অংশ। খোদ রাজধানীসহ বড় বড় শহরের প্রধান প্রধান শহরে পানি জমে যাওয়ার চিত্র দেখা যায় বর্ষা এলেই। দেশের নানা শহরে শহরে বহুতল ভবনের সামনে গাড়ির বদলে নৌকা বেঁধে রাখার চিত্রও দেখা যায়।
বাড়ে পাহাড় ধস
টানা বৃষ্টির জেরে বিপর্যস্ত হয় পাহাড়ের জনজীবন। পাহাড়ের অনেক এলাকায় ধস নেমে বন্ধ রয়েছে যান চলাচল। ধসের জেরে রাস্তার পাশে থাকা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মৃত্যুও ঘটে মানুষের।
আসে নানারকম রোগব্যাধিও
বর্ষাকাল এলেই দেখা যায় নানারকম রোগব্যাধি। বৃষ্টিতে বন্যা-জলাবদ্ধতা সঙ্গে করে নিয়ে আসছে নানা রোগের জীবাণু। তাইতো বর্ষার মৌসুম শুরু হলেই নানা রোগব্যাধি বেড়ে যায়। প্রায় সব পরিবারেই এই সময়ে কেউ না কেউ সর্দি, কাশি, জ্বরে ভুগে থাকে।
সব মিলিয়ে বর্ষা বাঙালির কাছে অতি আদরের ও অনন্ত বেদনার ঋতু রূপে পরিচিত। আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ জীবন প্রবাহের এক অপরিহার্য কল্যাণী ঋতুও এই বর্ষা। বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দূর আকাশের পানে চেয়ে নস্টালজিয়ায় ভুগবেন কেউ কেউ। আবার নগরবাসীর কেউ কেউ চোখ মেলে খুঁজবেন বৃষ্টি ভেজা কাক বা শালিকদের। জীবনটা স্বপ্নময় বা নস্টালজিয়ায় ভোগাতে বৃষ্টির যেন জুড়ি নেই। হয়তো আষাঢ় মাসকে ঘিরে মনে উদয় হবে বিচিত্র এক রূপ!