করোনাভাইরাসের কারণে চীনের সাথে পণ্য আনা-নেয়া ব্যহত হওয়ায় দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ শিল্প এবং ইলেক্ট্রনিক্সসহ মোট ১৪টি খাত চিহ্নিত করে সরকারকে এক রিপোর্ট পাঠিয়েছে, যাতে বলা হয়েছে চীনের সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানি উভয় খাতে আর্থিক ক্ষতির আশংকা রয়েছে।
এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে আমদানি করা পণ্য ও কাঁচামালের মজুদ প্রায় শেষ হয়ে যাবার কারণে উৎপাদন ও সরবারহ দুই ক্ষেত্রেই তারা ঝুঁকিতে রয়েছেন।
করোনাভাইরাসের কারণে গত দেড় মাসে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে এক ধরণের ধাক্কা লেগেছে।
তার একটি বড় কারণ বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৫ শতাংশ আসে চীন থেকে।
এছাড়া অনেক খাতের কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানির সিংহভাগ আসে চীন থেকে, আবার সেদেশে রপ্তানিও হয় বেশ কিছু পণ্য।
গত অর্থবছরে অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ ১ হাজার ৩৮৫ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আর রপ্তানি করেছে ৮৩ কোটি ডলারের পণ্য।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সরকারকে এক রিপোর্ট পাঠিয়েছে, তাতে মোট ক্ষতির কোন পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
তবে, তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ শিল্প এবং ইলেক্ট্রনিক্সসহ মোট ১৪টি খাত চিহ্নিত করে বলা হয়েছে চীনের সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানি উভয় খাতে আর্থিক ক্ষতির আশংকা রয়েছে।
যেসব খাত কমিশন চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে আমদানি ও রপ্তানি দুই-ই রয়েছে।
সংস্থার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ মোঃ আবু রায়হান আলবেরুনী বিবিসিকে বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কোন কোন খাতে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বাণিজ্য হয়ে থাকে।
কোন খাতে কেমন ক্ষতির আশংকা তাদের রয়েছে তা নিয়ে বলছিলেন মিঃ আলবেরুনী –
* তৈরি পোশাকের মধ্যে নিট খাতের ডাইং ও কেমিক্যাল এবং অন্যান্য অ্যাক্সেসরিজের ৮০-৮৫ শতাংশ আমদানি নির্ভর এবং সেগুলো চীন থেকে আসে। এর বাইরে ওভেন খাতের ৬০ শতাংশ আসে চীন থেকে।
* গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ, প্যাকেজিং খাতে চার বিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল দরকার হয়, এ খাতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছে।
* ভোগ্যপণ্যের মধ্যে ১৭টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন রসুন, আদা, লবণ, মসুর ডাল, ছোলা, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ আমদানি হয় চীন থেকে।
* ফিনিশ লেদার ও লেদার গুডস অর্থাৎ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের জন্য আঠা, ধাতব লাইনিং ও অ্যাক্সেসরিজের ৬০ শতাংশ আমদানি হয় চীন থেকে। এখাতে তিন হাজার কোটি টাকার মত ক্ষতি হবে।
* বাংলাদেশ থেকে সামুদ্রিক মাছ অর্থাৎ কাঁকড়া ও কুচে মাছ রপ্তানি হয়, এর ৯০ শতাংশই যায় চীনে
* ইলেকট্রিক্যাল, মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের ৮০-৮৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল চীন থেকে আসে,
* পাট স্পিনিং খাতে প্রতি বছর বাংলাদেশ চীনে পাট ও পাটজাত পণ্য ৫৩২ কোটি টাকার রপ্তানি করে। করোনাভাইরাসের কারণে এখন ক্ষতির পরিমাণ কত হবে তা নিরূপণের কাজ চলছে।
* মেডিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টস ও হসপিটাল ইকুয়িপমেন্ট তৈরি শিল্পের যন্ত্রাংশ চীন থেকে আমদানি হয়,
* কসমেটিক্স অ্যান্ড টয়লেট্রিজ খাতে প্রতি মাসে ৭৫ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য আমদানি হয়, যা এখন বন্ধ রয়েছে।
এছাড়া ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল এবং চশমা শিল্পের বাজারও চীন নির্ভর। ট্যারিফ কমিশন বলছে এসব জায়গায় সরকারকে নজর দিতে হবে।
তবে মিঃ আলবেরুনী বলেছেন, ১৪টি খাতের কয়েকটি খাতের কাঁচামালের মজুদে ঘাটতি দেখা দিলে বিকল্প কী চিন্তা করা যায়, সে বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঢাকার কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে আজ একটি বহুজাতিক ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের প্রতিষ্ঠানের একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে করোনাভাইরাসের প্রভাবে তাদের পণ্যের দেশীয় রিজার্ভ স্টক শেষ হয়ে আসছে, যে কারণে মার্চ মাসের প্রথম দিন থেকে তাদের ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম বাড়ছে।
ইলেকট্রনিক্স খাতের খুচরা ও পাইকারি আমদানি-কারকেরা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে চীন থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় বৈদ্যুতিক বাতি, মোবাইল অ্যাক্সেসরিজ, ও ঘড়িসহ অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে স্থানীয় বাজারে।
তবে বিভিন্ন খাতে আমদানি-রপ্তানির এই সংকটের আশংকার মধ্যেও অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন, এই পরিস্থিতির পুরোটাই বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক নয়।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএস-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ মনে করেন, আমদানির জন্য এখন ব্যবসায়ীদের বিকল্প চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হবে।
“একটা ক্ষতি যে যেসব পণ্যের কাঁচামাল না আসায় সেগুলোর উৎপাদন আটকে যাবে, সেগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে। কিন্তু দেশের ব্যবসায়ীরা যদি এখন আমদানি এবং রপ্তানির বিকল্প বাজার ও গন্তব্য খোঁজেন তাহলে অর্থনীতির উপকার হবে।”
“যেমন ধরুন অনেক দেশই হয়তো আগামি কিছুদিন চীন থেকে পণ্য আমদানি করতে চাইবে না, সেই সব বাজার যদি বাংলাদেশ ধরতে পারে, তাহলে নতুন বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।”
নাজনীন আহমেদ বলছেন, এক্ষেত্রে সরকারকে অর্থনৈতিক সহায়তার বদলে অনেক বেশি নীতি সহায়তার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সাহায্য করতে হবে।