দেয়াল জুড়ে রয়েছে মন ভোলান আলপনা। ছবি: সংগৃহীত

দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয় নাচোল। তেভাগা আন্দোলন কিন্তু বন্ধ হয়নি, বরং আরো ব্যাপক হয়ে ওঠে। আজও নাচোলের গ্রামে গ্রামে ইলা মিত্র এবং কৃষক বিদ্রোহের নানা কাহিনি মুখে মুখে ফেরে। 

আরেকটি কারণেও নাচোলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। 

ইলা মিত্রের স্মৃতি বিজড়িত গ্রাম ‘টিকইল’। সেখানে গেলে আপনার মনে হবে, কোনো উন্মুক্ত আর্ট গ্যালারিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রত্যেকটি বাড়ির ভেতরে কিংবা বাইরের দেয়াল জুড়ে রয়েছে মন ভোলান আলপনা। যা নান্দনিক গুণে বেশ অসাধারণ। কয়েকশ বছর ধরে চলছে এমন আয়োজন। বাংলাদেশের মানুষ টিকইলকে ডাকেন ‘আলপনা গ্রাম’ নামে।

ইলা মিত্রের স্মৃতি বিজড়িত গ্রাম ‘টিকইল’। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ধার ঘেঁষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গ্রাম টিকইল। এখানে প্রতিটি বাড়ির দেয়াল, শোয়ার ঘর কিংবা রান্নাঘরও আলপনার ছোঁয়া থেকে বাদ যায় না। ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং ঘর সাজানোর জন্যই আলপনা দেওয়া শুরু হয়েছিল। 

জানা যায়, বেশ অনেক বছর আগে মাত্র কয়েকটি বাড়িতেই আলপনা হতো। পরে সেই চর্চা ছড়িয়ে যায় সারা গ্রামে। গ্রামবাসীরা মনে করেন, আলপনা থাকলে সংসারে পবিত্রতা আসে, সবার মন প্রফুল্ল থাকে। এক সময় বাড়ির আলপনার সৌন্দর্য বিচার করে সেই পরিবার থেকে পাত্র অথবা পাত্রী নির্বাচন করতেন বয়োজ্যেষ্ঠরা।

প্রধানত গ্রামের মেয়েরাই আলপনা আঁকায় পারদর্শী।

প্রধানত গ্রামের মেয়েরাই আলপনা আঁকায় পারদর্শী। তবে ছেলেরাও হাত লাগান মাঝেমাঝে। আগেকার দিনে খড়িমাটি, গিরিমাটি, লাল মাটি, আলো চাল এবং নানা প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হতো এমন আলপনায়। কিন্তু সেই আলপনা বেশিদিন স্থায়ী হতো না। এখন বাজার থেকে কেনা কৃত্রিম রং কাজে লাগান গ্রামবাসীরা। ফলে আলপনা নষ্ট হয় না সহজে।

টিকইল গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়িতে আলপনার ধরন আলাদা আলাদা। এক বাড়ির সঙ্গে অন্য বাড়ির মিল নেই। তবে দেখন বর্মনের আলপনা সবথেকে বিখ্যাত। তার বাড়িকে সবাই ‘আলপনা বাড়ি’ নামে ডাকে। গৃহবধূ দেখন বর্মন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটা আমার শখের কাজ। এটা আমি ভালোবাসি। লোকে আমার বাসা দেখতে আসে। তাতেই আমি ভালোবাসা পাই।’ 

দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয় নাচোল।

বাংলাদেশ সরকার থেকে একটি পাকা বাড়ি দেওয়া হয়েছে দেখন বর্মনকে। আলপনা দিয়ে সবকটি ঘর তিনি সাজিয়ে রেখেছেন। পরিদর্শন খাতাও রয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য।

টিকইল গ্রামের লোকেরা আশা করেন, একদিন তাদের আলপনার ঐতিহ্য আশেপাশের গ্রাম এবং সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।