চীন ও জাপানের মধ্যকার বিরোধ বহু প্রাচীন। তবে ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে চীনে জাপান যা ঘটায়, তাকে বর্বরতম ঘটনা বললেও কম হয়ে যায়। সে বছরের ১৩ ডিসেম্বর ক্ষুদ্র পরিকল্পনায় চীন দখল করতে শুরু করে জাপান। এ সময়ে জাপানি বাহিনী প্রায় ৩ লাখ বেসামরিক ও নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে। ধর্ষণ করা হয় হাজার হাজার নারী, তরুণী এমনকি বৃদ্ধাকেও। পাশাপাশি লুটতরাজ তো ছিলই।

আইরিশ চ্যাঙ-এর বিশ্ব আলোড়িত বইয়ে যে বিবরণ পাওয়া যায় তা নিঃসন্দেহে চমকে ওঠার মতো। বইটিতে বলা হয়েছে- পৃথিবীর ইতিহাসে নানকিংয়ে সংঘটিত গণহত্যা ও নির্যাতনকে একমাত্র তুলনা করা যেতে পারে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের কর্তৃক পরিচালিত গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের সঙ্গে। চ্যাং তার সেই কালজয়ী বইটিতে লিখেছেন এভাবে- ‘একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, এটা (নানকিং গণহত্যা) ছিল বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আকারের ধর্ষণযজ্ঞগুলোর অন্যতম। দ্য রেপ অব নানকিং ছিল যুদ্ধকালীন ধর্ষণকাণ্ডের সম্ভবত একক জঘন্য দৃষ্টান্ত, যা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল বেসামরিক জনগণের ওপর। এ ঘটনার একমাত্র তুলনাই আছে ইতিহাসে; তা হল- বাঙালি নারীদের সঙ্গে পাকিস্তানিদের যেসব অপকর্ম একাত্তর সালে, সেটা।’

বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে- জাপানিরা চীনের তৎকালীন রাজধানী নানকিং (বর্তমানে নানজিং) কীভাবে দখল করা হয়েছে। আইরিশ চ্যাঙ-এর বয়ানে, রক্তের বন্যায় ভেসে যাওয়া সাংহাই থেকে জাপানিরা এগিয়ে যায় নানকিংয়ের দিকে। এত এত সৈন্য মারা যাওয়ায় মনোবল হারিয়ে চীনও পিছু হটে যায়। চীনা সরকারের সৈন্য নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ভয় জাপানিদের মনোবল আরো বাড়িয়ে দেয়। সৈন্যদের নানকিং থেকে সরিয়ে নিলেও পাঁচ লাখ সাধারণ মানুষকে পালাতে বাধা দেয় চীন। এগিয়ে আসার সময় জাপানিরা পথে যা পায় তা-ই ধ্বংস করে এবং যারাই ওদের হাতে ধরা পড়ে তাদেরকেই হত্যা করে।

একটা বিবরণে বলা হয়েছে, অসুস্থ মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল ৯ বছরের চ্যাং ঝি কিয়াং। পথে তাদেরকে আটকে ফেলে সৈন্যরা। তার মাকে ধর্ষণ করতে চায়। ছোট্ট কিয়াং কোনো উপায় না পেয়ে তাদের মুখে থু-থু নিক্ষেপ করে প্রতিবাদ করে। সৈন্যরা তখনই তাকে ছুঁড়ে ফেলে। এরপর তার মাকে বিবস্ত্র হতে বলে। কিয়াংয়ের মা কিছুতেই রাজি না থাকায় স্তনে বেয়নেট দিয়ে সজোরে আঘাত করে। এতে তার মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মৃত ভেবে সৈন্যরা চলে যায়। কিয়াং এবার গিয়ে তার মাকে ডেকে তোলার চেষ্টা করে। তার বুকের ক্ষত পরিমাপ করতে বস্ত্র সরাতেই ক্ষুধার্ত ছোট ভাইটি মায়ের স্তনে মুখ দেয়। কিন্তু তার মুখ ভরে উঠে রক্তে। ততক্ষণে তার মা সত্যিই না ফেরার দেশে চলে গেছে।

আইরিশ চ্যাঙ তার আলোচিত বইটিতে উল্লেখ করেন যে- চ্যাং ঝি কিয়াং একটা উদাহরণ মাত্র। এমন হাজারো ঘটনা ঘটেছে চীনের পথে-ঘাটে। গরীব-ধনী থেকে শিশু-বৃদ্ধ কেউই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। বর্বরতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কে কার আগে একশ’ চীনা নাগরিকের প্রাণনাশ করবে সে প্রতিযোগিতা। জাপানি কমান্ডার মুকাই এবং নদার এ প্রতিযোগিতার প্রবর্তক ছিলেন। এটাই ছিল জাপানি গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম। কে কতটা হত্যা কিংবা ধর্ষণ করতো তা ‘বাহবা’ হিসেবে ফলোআপ হতো দেশটির শীর্ষ পত্রিকাগুলোতে। যেন ক্রিকেটের কোনো টেস্ট ম্যাচের স্কোর!

চীনা প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরা লেখককে বলেছে, জাপানি সেনারা রাস্তায় ফেলে ধর্ষণ করেছে দশ বছরেরও কম বয়সী বালিকাদের। তারপর তাদেরকে দু-টুকরো করেছে তরবারির কোপে। অনেক মেয়েকে উলঙ্গ অবস্থায় চেয়ার, বিছানা বা খুঁটির ওপর বেঁধে রেখেছিল তারা, যাতে ধর্ষণ করা সহজ ও আরামদায়ক হয়। এদের অনেকেই এত নির্যাতন সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারেনি। আবার অনেককেই রাস্তায় ধর্ষণ করা হয়েছে। এরপর গোপনাঙ্গে বীয়ারের বোতল ও গলফ স্টিক ঢুকিয়ে দেয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত গুলি করে হত্যা করে।

জাপানি বর্বরদের শিকার শুধু যে নরীরাই ছিল তা নয়। চীনা পুরুষরাও রক্ষা পায়নি। কিশোর থেকে বৃদ্ধ— সব ধরনের পুরুষের ওপর চালানো হতো সমকামিতা। নানারকম বীভৎস ও ঘৃণ্য বিকৃত যৌনকর্ম চালানো হতো জাপানি সৈনিকদের বিনোদনের ঘাটতি পূরণে। মনে হয় নানকিং নগরীতে জাপানিরা যেসব মানবিক অধঃপতন ও বিকৃতির সামর্থ্য দেখিয়েছে তার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। হত্যাকর্মের একঘেয়েমি কাটিয়ে তোলার জন্য কিছু জাপানি সৈনিক উদ্ভাবন করেছিল ভিন্নধর্মী হত্যা প্রতিযোগিতা। মানবিকতার এমন বিপর্যয়ের কারণেই হয়তো নানকিং নগরের পতনের ঘটনাটা ইতিহাসের পাতায় ‘দ্য রেপ অব নানকিং’ হিসেবে পরিচিত।

টানা ছয় সপ্তাহ চলে জাপানিদের এমন বর্বরতা। ৩ লাখ মানুষকে হত্যা, ৮০ হাজার নারী ধর্ষণ করে এই অল্প সময়ে। এসব হত্যা ও ধর্ষণের সব আলামত পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, সবকিছুই শুধুমাত্র সৈন্যদের নিজের ইচ্ছাতেই হয়েছে এমন নয়। বরং হত্যা ও ধর্ষণের ব্যাপকতা দেখে পরবর্তীতে ধারণা করা হয়, ব্যাপারগুলো ছিল পরিকল্পিত এবং সৈন্যদের এমন কাজ করার জন্য হয়তো কোনো গোপন নিদের্শনাও প্রদান করা হয়েছিল। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বিশ্বকে বেরিয়ে আসতে হলে চীনা নাগরিকদের ওপর এবং একাত্তরে বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছে, তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে বলে মনে করেন লেখক আইরিশ চ্যাঙ। তার মতে, শুধুমাত্র নিহতদের সংখ্যা ব্যবহার করলে এ দুই বর্বরতম ঘটনা ছাপিয়ে যাবে ইতিহাসে অন্যান্য ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডকে। 
 
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর চালানো নির্যাতনের ভয়াবহতা ছিল এর চেয়েও ভয়ংকর। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা উইমেনস মিডিয়া সেন্টার পরিচালিত উইমেন আন্ডার সিজ প্রজেক্ট এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী এই যুদ্ধের সময়ে অন্তত চার লাখ নারী সম্ভ্রমহানির শিকার হন। উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীর সদস্যরা অন্তত দুই থেকে চার লাখ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করে।

গবেষকদের মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলিম এবং সংখ্যালঘু হিন্দু উভয় সম্প্রদায়কে ভীতসন্ত্রস্ত করতে এই ধর্ষণ চালানো হয়েছিল। এর ফলে হাজার হাজার নারী গর্ভধারণ করেন, যুদ্ধশিশুর জন্ম হয় এবং গর্ভপাত, আত্মহত্যা ইত্যাদি সমস্যার সূত্রপাত হয়।

জেনারেল টিক্কা খান ছিলেন অপারেশন সার্চলাইট এর প্রণেতা। তার নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে আক্রমণ পরিচালনা করে এবং তিনি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তারিখে ঘোষণা করেন, ‘আমি এই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘুতে পরিণত করবো।’ এই উপমাটি ছিল একটি সংকেত যার মাধ্যমে তিনি সামরিক অভিযানকালে গণধর্ষণকে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহৃত কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেন। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ হতে জানা যায়, রাতের বেলা অভিযান পরিচালনাকালীন আক্রমণকারীরা গ্রামের মহিলাদের ওপর চড়াও হতো; প্রায়শই ত্রাস সৃষ্টির অংশ হিসেবে তাদের পরিবারের সদস্যদের সামনেই ধর্ষণ করত। এছাড়াও ৮ থেকে ৭৫ বছর বয়সী নারীদের অপহরণ করে বিশেষভাবে নির্মিত শিবিরে নিয়ে যাওয়া হতো যেখানে তারা বারবার লাঞ্ছিত হতো। ক্যাম্পে বন্দি থাকা অনেককেই হত্যা করা হয় অথবা তারা নিজেরাই আত্মহত্যা করে; কিছু নারী তাদের নিজেদের চুল ব্যবহার করে আত্মহত্যা করায় সৈন্যরা বন্দিনীদের চুল কেটে দেয়। যারা অপহৃত হয়েছিলো এবং সেনাবাহিনীর হাতে আটক ছিলো এ ধরনের ৫৬৩ জন নারী সম্পর্কে টাইম ম্যাগাজিনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যেখানে বলা হয় যখন সেনাবাহিনী তাদেরকে মুক্তি দেয়া শুরু করে তখন এদের সবাই তিন হতে পাঁচ মাসের গর্ভবতী ছিলো। কিছু নারীকে জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। বিভিন্ন হিসাব মতে এই সংখ্যা আনুমানিক ২,০০,০০০ হতে ৪,০০,০০০। পাকিস্তান সরকার নির্যাতন সম্পর্কিত প্রতিবেদন এই অঞ্চলের বাইরে পাঠাতে বাধাদানের চেষ্টা করলেও গণমাধ্যমে নৃশংসতার সংবাদ বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হওয়ায় সাধারণ্যে তা পৌঁছে যায় এবং এটি স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য ব্যাপক আন্তর্জাতিক জনসমর্থন বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।

জেনিক এ্যারিন্স কর্তৃক বিবৃত আছে যে- কোনো একটি জাতিগত গোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য একটি ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা হিসেবে অসংখ্য নারী ধর্ষিত হয়, হত্যা করা হয় এবং এরপর যৌনাঙ্গের মধ্যে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করা হয়। 

কানাডীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যাডাম জোনস বলেছেন, এই গণধর্ষণের অন্যতম একটি কারণ ছিল বাঙালি নারীদের ‘অসম্মান’ করার মাধ্যমে বাঙালি সমাজের মনস্তাত্ত্বিকভাবে পতন ঘটানো এবং সেজন্য কিছু নারীকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ধর্ষণ করা হয় অথবা বারংবার এভাবে আঘাতের কারণে নিহত হয়। 

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন ফর জাস্টিস মন্তব্য করেছে, ‘পাকিস্তানের সশস্ত্রবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা ছিলো একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী দ্বারা স্বেচ্ছায় গৃহীত নীতির একটি অংশ’। 

লেখক মুলক রাজ আনন্দ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে বলেছেন, ‘ধর্ষণগুলো এতোটাই পদ্ধতিগত এবং পরিব্যাপক ছিলো যে এগুলো সচেতনভাবে গৃহীত সমরনীতির অংশ ছিলো, পশ্চিম পাকিস্তানিদের কর্তৃক পরিকল্পিত একটি নতুন জাতি তৈরি করতে ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে হালকা করে দিতে।’ 

দ্য রেপ অব নানকিংয়ের মতো ঘটনাকে সবার সামনে আনার জন্য আইরিশ চ্যাঙ-এর প্রতি বিশ্ববাসীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত দুটো কারণে। প্রথমত নানকিং এর ভয়াবহ গণহত্যার ৩১ বছর পরে তিনি বইটি লিখে সারা দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয়ত গবেষণাধর্মী এ বইয়ে লেখক তার স্বীয় জাতির ওপর চালানো বর্বরতার তুলনা করতে গিয়ে একাত্তরের গণহত্যার কথা তুলে এনেছেন।