গনেশ চন্দ্র হাওলাদার
পরকীয়া দাম্পত্য তথা পারিবারিক জীবনে অত্যন্ত জটিল নেতিবাচক সম্পর্কের অন্যতম একটি দিক। বিশ্বের কোন দেশেই পরকীয়া সম্পর্ক বা পরকীয়া প্রেমকে পুরোপুরি বৈধ বলে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়া না হলেও কিংবা সহজ স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা না হলেও এর বিস্তার দিন দিন আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরকীয়া প্রেম একটি সামাজিক অনাচার, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী একথা জেনেও করোনাকালীন সময়েও প্রতিনিয়ত এসম্পর্কিত ঘটনা আমাদের দেশেও ঘটছে। পরকীয়া নামের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের করাল থাবায় সংসার ও পরিবার প্রথা কিছুটা বিপর্দস্থ। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজ, লোকচক্ষু বিশেষ করে সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তা করে বেশিরভাগ ভূক্তভোগী নিরবে সহ্য করতে বাধ্য হয় পরকীয়া প্রেম নামক এই নিষিদ্ধ প্রণয়লীলা। পরকীয়ার নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে প্রতিনিয়ত স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হচ্ছে, বিবাহ বিচ্ছেদও ঘটাচ্ছে কোন কোন ক্ষেত্রে, সন্তানদের ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যত জীবনে, কেহ কেহ এমনকি আত্মহননের মতো অভিশপ্ত পথও বেছে নিচ্ছে।

‘পরকীয়া’ বলতে অন্যের স্বামী বা স্ত্রীর সাথে বিবাহবহির্ভূত প্রেম বা প্রণয় কে বুঝায়, ইংরেজিতে আমরা বলি- Extra Marital Affair, Adultery, Extramarital affair, Extramarital sex । সাধারণত বিবাহিত নর কিংবা নারীর পর নারীতে বা পরপুরুষ আসক্তি ও শারীরিক সম্পর্ক পরকীয়া হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের আইনে বিবাহিত নারী বা পুরুষের অন্য কারো সাথে যৌন সম্পর্ক হলে তাকে ‘ব্যভিচার’ বলা হয়েছে। এসম্পর্কিত আইনের দন্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির স্ত্রী অথবা যাকে সে অন্য কোনো ব্যক্তির স্ত্রী বলে জানে বা তার অনুরূপ বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে এমন কোনো ব্যক্তির সঙ্গে উক্ত অন্য ব্যক্তির সম্মতি ও সমর্থন ব্যতিরেকে এরূপ যৌনসঙ্গম করে যা নারী ধর্ষণের সামিল নয়, সে ব্যক্তি ব্যভিচারের অপরাধে দোষী এবং যেকোনো বর্ণনার কারাদন্ড যার মেয়াদ ৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদন্ডে বা উভয়দন্ডে দন্ডনীয় হবে। অনুরূপ ক্ষেত্রে স্ত্রী লোকটি দুষ্কর্মের সহায়তাকারী হিসেবে দন্ডিত হবে না। ’
বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই পরকীয়া সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে অগ্রণযোগ্য আচরণ। কিছু কিছু দেশে তো ঘোরতর অপরাধ। কিন্তু ‘নিষিদ্ধ’ এই বিষয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছেই। সারা বিশে^ই ক্রমাগতভাবে দ্রুত বাড়ছে পরকীয়া। সাধারণতঃ পুরুষদের পরকীয়া প্রেমের ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যাক্তিটি কম বয়সী কোন অল্প বয়সী মহিলা এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে যুবতীও হয়ে থাকেন। মহিলাদের ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যাক্তিটি সাধারণতঃ কোন মধ্যবয়সী পুরুষ হয়ে থাকেন। পুরুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগীয় ও অর্থ সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এবং শারীরিক চাহিদা থেকে পরকীয়ায় জড়ায় নারী। এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরকীয়ার প্রবণতা পশ্চিমা বিশ্বে। পশ্চিমা দুনিয়ায় স্বামীরা অহরহই স্ত্রীদের ধোকা দেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরকীয়া নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আইন জারি রয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে এক রায়ে পরকীয়াকে বৈধতা দেয়। পাকিস্তান ১৯৭৯ সালের হুদুদ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী পরকীয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করে। ফিলিপিন্সে পরকীয়া অপরাধ। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্র চীনে পরকীয়াকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মীয় রক্ষণশীল দেশ সৌদি আরবে পরকীয়াকে বিরাট অপরাধ বলে গন্য করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় পরকীয়া অপরাধ নয়। তাইওয়ানে পরকীয়া বরাবরই অপরাধ। যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি রাজ্যে পরকীয়াকে এখনও অপরাধ বলে গন্য করা হয়। ইউরোপ কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় পরকীয়া কোনও অপরাধ নয়। সোমালিয়াতে পরকীয়া গুরুত্বর অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়।

পশ্চিমা বিশ্বে পরকীয়া নিয়ে গবেষণা ও জরিপ হলেও বাংলাদেশে তা দৃশ্যমান নয়। তবে শুধু ঢাকা সিটি করপোরেশন বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদনের পরিসংখ্যান মতে, ২০১৯ সালের বিগত ৬ মাসে অর্থাৎ ১৮০ দিনে ৪ হাজার ৫৫৭টি তালাকের আবেদন হলে একদিনে আবেদন হয়েছে ২৬টি তালাকের। পরকীয়াই এসব আবেদনের অনেকগুলো কারনের মধ্যে অন্যতম একটি কারন। পরকীয়ার ফলাফল বিশ্লেষণে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অসংখ্য ঘটনার মধ্যে থেকে দুটি ঘটনা- (১) গৃহবধূ সালমার ১৬ বছর আগে সখিপুর উপজেলা সদরের পৌরসভা এলাকার ৩নং ওয়ার্ডে রিপন সিকদারের সাথে বিয়ে হয়। তাদের সংসারে সিহাব (১৩) ও রোজা (৮) দুটি সন্তান রয়েছে। স্বামী রিপন সিকদারের সাথে বাসার ভাড়াটিয়া শিরিন আক্তারের সাথে পরকিয়ার সম্পর্ক কয়েকবার আপত্তিকর অবস্থায় দেখে স্বামীকে সালমা সর্তক করলেও সে কর্ণপাত করেনি। উল্টো বিষয়টি নিয়ে জানাজানি করার কারণে তাকে মেরে লাশ গুম করার হুমকি দেয়। তারই পরিকল্পনার অংশ হিসাবে গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ গৃহবধূর স্বামী ও তার প্রেমিকা মিলে রড দ্বারা মাথায় আঘাত করলে মাথা ফেটে মগজ বেরিয়ে পড়ে এবং চাকু দিয়ে গলার শ্বাসনালী কেটে ফেলে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এ ব্যাপারে হত্যা মামলা দায়ের করেছে নিহতের ভাই। (২) বন্দর থানার নিমতলায় স্বামী ও মেয়েকে খুন হতে হলো স্ত্রী ও পরকীয়া প্রেমিকের হাতে। দামপাড়া পুলিশ লাইনসে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগম। পাশের বাসার মাঈন উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে মায়ের অবৈধ সম্পর্ক দেখে ফেলে শিশুকন্যা ফাতেমা খাতুন (৪)। বাবা বাসায় এলে এ সম্পর্কের কথা বলে দেবে বললে ওই শিশুকে হত্যা করেন মা ও তার পরকীয়া প্রেমিক। পরে আবু তাহের বাড়িতে এলে পরকীয়া প্রেমিক মাঈন উদ্দিন ও স্ত্রী হাছিনা বেগম তাকে জাপটে ধরেন। গলায় রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে পেটে ও মাথায় ছুরিকাঘাত করে তাকেও হত্যা করেন। এ মামলায় হাছিনা আক্তার ও পরকীয়া প্রেমিক মাইন উদ্দিনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে‡(২১ অক্টোবর, ২০১৯)i

পরকীয়ার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে, অল্প বয়সে বিয়ে, শারীরিক সমস্যা, বিয়ের ক্ষেত্রে ভুল মানুষকে নির্বাচন করা, ক্যারিয়ার আডভান্সমেন্ট নিতে গিয়ে উর্দ্ধতনকে খুশি করা, পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি, বৈবাহিক জীবনে অসুখী, অবজ্ঞা, অচেনা মানুষদের সাথে কৌতুহলবশতঃ কথা ও চ্যাটিং করা এর মধ্যে অন্যতম। স্বামী স্ত্রীর চাহিদাকে গুরুত্ব না দেওয়া। ভালো আচরণ ও শারীরিক সম্পর্কে প্রতি গুরুত্ব না দেওয়া। স্ত্রী স্বামী’র চাওয়া পাওয়ার প্রতি গুরুত্ব না দেওয়া। তাঁর মধ্যে হতে পারে স্বামীর সাথে ভালো ব্যবহার না করা, শারীরিক সম্পর্কে অস্বীকৃতি সহ স্বামীর যৌন কার্যে সাড়া না দেওয়া। বর্তমানে পরকীয়ার প্রবণতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধির কারন তথ্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় মোবাইল ফোন মানুষের হাতের মুঠোয়, তাই ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জাওে সেকেন্ডের ব্যবধানে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের চেনা-অচেনা নারী পুরুষ পরস্পরের বন্ধু হতে পারছে বিধায় পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে তোলা অনেক সহজ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।
তবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পরকীয়া নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বিবাহবহির্ভূত প্রেম করার ডেটিং অ্যাপ গ্লিডেনের জরিপ পরিচালনায় উঠে এসেছে। পরকীয়া আসক্ত ৫৫ শতাংশ ভারতীয়। যারা মধ্যে অধিকাংশই নারী। কলকাতা সহ ভারতের আট শহরে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। এ তথ্য বাংলাদেশের জন্যও অস্বস্থিকর কেননা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ ভারতীয় আকাশ সংস্কৃতির মাধ্যমে – ধারাবাহিক নাটক, সিনেমা, সংগীতের শ্রোতা ও দর্শক।

পরকীয়া একটি অসুস্থ প্রবল আকর্ষণধর্মী আবেগের নাম। যত উদার দেশই হোক না কেন পৃথিবীর কোন দেশ ও সমাজের মানুষই পরকীয়া করে তা প্রকাশ্যে বলা বা প্রকাশের মত সাহস দেখাতে পারে না। এ থেকে খুব সহজেই বোঝা উচিত কোন কোন কোন দেশ বাধ্য হয়ে আইনে পরকীয়াকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা না করলেও বিবাহের বিকল্প হিসেবে স¦ীকৃতি প্রদান করে না, কারন পরকীয়া পরিবার, সমাজ ও দেশ তথা সারা বিশে^র স্বাভাবিকতার জন্য ক্ষতিকর। পিতামাতার পরকীয়া সংশ্লিষ্ট পরিবারের সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এবং সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগে বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সন্তানের মানসিক বিষন্নতার ও আগ্রাসী মনোভাবের জন্ম দেয় যা সমাজ ও দেশের সামগ্রিক অপরাধ বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশের সমাজে এমন কি ধর্মেও এই পরকীয়া সম্পর্ককে অবৈধ সম্পর্ক হিসেবে বলা হয়েছে।

বর্তমান বিশ্বের সামগ্রিক দিক বিবেচনায় পরকীয়ার বিস্তার হয়ত পুরোপুরি থামিয়ে দেয়া সহজ নয় তবে একেবারে অসম্ভবও নয়। নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি মানুষের মনের আকর্ষণ স্বাভাবিক। সেই আকর্ষণকে মোকাবেলা করাটাই হলো একজন ভালো মানুষের কাজ। মানুষের মনের মন্দ চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হতে মানুষকে সাহায্য করে তার শিক্ষা, তার ধর্ম, তার পারিবারিক মূল্যবোধ এবং আরো অনেক কিছু। স্বপ্ন আর ভালবাসা নিয়ে সারা জীবন এক সাথে কাটিয়ে দেয়ার জন্য আমরা বিবাহ নামক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকি। এই বন্ধনকে আরও মজবুত করতে সঙ্গীর সাথে শেয়ার করুন আপনি কি চান, আবার এটাও খেয়াল করুন আপনার সঙ্গী আপনার কাছ থেকে কেমনটা আশা করছে । দু জনেই যদি দুজনের ভালো লাগা, মন্দ লাগা গুলোকে শ্রদ্ধা করেন, নিজেদের মানসিক দূরত্ব কমিয়ে ফেলেন তাহলে দেখবেন জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে। পারস্পরিক দূরত্ব বাড়াার সম্ভাবনাও কমে যাবে অনেকটাই। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরস্পরের মধ্যে বিশ^াসের ভীত খুব শক্ত থাকতে হবে, আবেগ দিয়ে নয়, বরং বিবেক দিয়ে প্রতিটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ধর্মীয় রীতি-নীতি বিধি-বিধান মেনে চলা ও নৈতিকতা শিক্ষায় নিজেদেরকে আরও বেশি ব্যাপৃত রাখতে হবে। পরকীয়ার মতো অভিশপ্ত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা, জনসচেতনতা সৃষ্টি ও এর কুফল নিয়ে প্রচারণার প্রয়োজন। এটিকে একটি অসামাজিক ব্যাধি বিবেচনায় একটি জরিপ, পরিসংখ্যান থাকা প্রয়োজন। যাতে একে অঙ্কুরে নির্মূল করা সম্ভবপর হয়। দেশ ও সমাজের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিবর্গসহ আপাময় সকলের মধ্যে এর কুফল সম্পর্কে সচেতনাতা সৃষ্টির মাধ্যমে পরকীয়া নামক অভিশাপকে সমাজ থেকে দূর করা সম্ভব হবে। লেখকঃ বার্তা সম্পাদক, দৈনিক দর্পণ প্রতিদিন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে