গনেশ চন্দ্র হাওলাদার
প্রতিদিনের অনলাইন ও প্রিন্ট পত্রপত্রিকা, সোস্যাল মিডিয়া ও টেলিভিশনসহ অন্যান্য প্রচারমাধ্যমের খবরে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকাতেও যৌন নির্যাতনের এক বা একাধিক ঘটনা আমারা জানতে পারছি। বিশ^ব্যাপী করোনা মহামারীর মধ্যে মানুষ মৃত্যু ভয়ে যেখানে অপরাধমূলক কাজ থেকে বিরত থাকার কথা সেখানে বাংলাদেশে থেমে নেই যৌন নির্যাতনের মত ভয়াবহ অপরাধ, বরং তা যেন আরও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২-৩ মাসের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধা কেহই রেহাই পাচ্ছে না এরকম চরম অবমাননাকর ও নিষ্ঠুর ঘটনাবলীর করাল গ্রাস থেকে। এমনকি ছেলে শিশু ও কিশোররাও রেহাই পাচ্ছে না যৌন নির্যাতনবা বলাৎকার নামক এ নিষ্ঠুরতার হাত থেকে। বাংলাদেশে বর্তমানে অবাধ তথ্য প্রবাহ ও শক্তিশালী গনমাধ্যমের কারনে ইভ টিজিং, যৌন হয়রানী, ধর্ষণ, বলাৎকারের মত ঘটনাগুলো আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেইসাথে সাথে জানতে পারছি।
নারী ও শিশু যৌন হয়রানীর মধ্যে সবচে গুরুতর অপরাধ ‘ধর্ষণ’। পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ট আত্মীয় সম্পর্কীয় ব্যক্তি, প্রতিবেশী, বন্ধু, প্রেমিক থেকে শুরু করে প্রায় সকল শ্রেণীপেশার চেনা-অচেনা ব্যক্তি কর্তৃক এরকম জঘণ্য নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন আমাদের দেশের শিশু, কিশোরী, যুবতী বিবাহিত অবিবাহিত নারীরা। সম্প্রতি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি ঘটনা ও সময়কালের দিকে নজর দিলে দেখা যায়-
স্বামীর জন্য রক্ত যোগাড় করতে গিয়ে মনিপুরে গৃহবধূ ধর্ষিত, রিমান্ডে দুইজন। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০। সিলেটের এমসি কলেজ হোস্টেলে স্বামীকে বেঁধে রেখে এক তরুণীকে গণধর্ষণ। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০।চট্টগ্রামে আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার তরুণী, দম্পতি আটক। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০।রাজশাহীর তানোর ৩ দিন আটকে রেখে কিশোরীকে ধর্ষণ, ফাদার গ্রেফতার। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। বরগুনার তালতলীতে বৃদ্ধ সোবাহান হাওলাদারকে (৬৫) নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে ১১ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করেন। অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ২৮ সেপ্টেম্বও ২০২০। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আপন দুই বোনকে ধর্ষণের মামলায় গ্রেফতার আবু বক্কর (৫৫) দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। একজনের বয়স ১৫ বছর এবং অন্যজনের ১১ বছর। ৫ অক্টোবর ২০২০। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের পল্লীতে গণধর্ষণের পর তরুণীর কাপড় ছিঁড়ে ফেলে তাকে বিবস্ত্র করে ছেড়ে দেয় ধর্ষকরা। ১৩ অক্টোবর ২০২০। গাজীপুরের শ্রীপুরে বিয়ের পানিপড়া খাইয়ে তরুণীকে ধর্ষণ করল কবিরাজ ২০ অক্টোবর ২০২০। নাটোরের বড়াইগ্রামে ছাত্রীকে (১৩) ধর্ষণের পর কাউকে না বলতে ওয়াদা করান মাদ্রাসা সুপার ইসমাইল হোসেন (৩৪)। তাকে আটক করে পুলিশ। ২৪ অক্টোবর ২০২০। ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ, আশ্রয়স্থলে গণধর্ষণের শিকার। এ ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। ২৬ অক্টোবর ২০২০। নোয়াখালীর সেনবাগে বাবাকে মারধরের পর কিশোরীকে তুলে নিয়ে ধষর্ণচেষ্টা। ৩০ অক্টোবর ২০২০। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় তৃতীয় শ্রেণির এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে (৯) তার সৎ চাচা ধর্ষণ করেছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় এক নারীকে স্বামীর পরকীয়ার মিথ্যা তথ্য দিয়ে ডেকে নিয়ে বাড়িতে আটকে রেখে টানা ছয়দিন ধর্ষণ করা হয়েছে। ২২ অক্টোবর ২০২০।কুমিল্লার তিতাসে আড়াই বছরের শিশুর গলায় ছুরি ধরে হত্যার ভয় দেখিয়ে তার দেবর কর্তৃক নারীকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত শাওনকে (৩৫) গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। ১৮ অক্টোবর ২০২০।বরিশালের হিজলা উপজেলার বড়জালিয়া ইউনিয়নের বাউশিয়া গ্রামে স্বামীকে হত্যার ভয় দেখিয়ে টানা চার বছর এক গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ২৯ অক্টোবর ২০২০। নেত্রকোনা পৌর শহরের কাটলী গ্রামের ৫ম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়েকে ধর্ষণ করেনসৎ বাবা রাসেল মিয়া (৩২) । ২৯ অক্টোবর ২০২০। খালা বাসায় না থাকার সুযোগে ১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করেছে আপন খালু। শিশুটির খালা বাসায় না থাকা অবস্থায় গত তিন মাস ধরে খালু চুন্নু মিয়া বিভিন্ন সময় শিশুটিকে ধর্ষণ করেছে।টিকটক ভিডিও করার নামে আটকে রেখে রাজধানীর কুড়িলে অক্টোবর মাসের ১৬ থেকে ২৬ তারিখ টানা ১১ দিন ধরে ৪ কিশোরীকে বাসায় আটকে রেখে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগে হৃদয় (২৪) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সিলেট সদর উপজেলায় এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও সেই ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করার অভিযোগে এক ইউপি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। উপজেলার গোপাল এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।সিদ্ধিরগঞ্জে ঘরের বাইরে পাহারা বসিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী (১১)কে ধর্ষণের ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২১ অক্টোবর ২০২০।চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার নওদা হরিশপুর গ্রামে ৭ বছরের নাতনিকে ধর্ষণের অভিযোগে দাদা মোনতাজ আলীকে (৫৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২০ অক্টোবর, ২০২০।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালের ধর্ষণের পরিসংখ্যানেপুলিশের অফিশিয়ালহিসাব মতে: ২০১৯ সালে ৫ হাজার ৪০০ নারী এবং ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি এবং নারী ধর্ষণের মামলা ছিল ৩ হাজার ৯০০টি। পুলিশের হিসাব বলছে, গত বছর ধর্ষণের কারণে ১২ শিশু এবং ২৬ জন নারী মারা যান। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ২১ নারী ও ১৪ শিশু।তবে বাস্তবে ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা মামলার চেয়ে দ্বিগুণ হবে।কেননা অনেকেই লোক লজ্জার কারনে কিংবা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে পারিবারিকভাবে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করে।
কিশোরী মেয়েরা বিশেষ করে স্কুল ছাত্রীরা ইভ টিজিংয়ের শিকার বেশী হয় এবং একারণে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে। যৌন নির্যাতন করা এবং তার ভিডিও ধারন করে বার বার ধর্ষণ করা, পর্নোগ্রাফি তৈরিতে ব্যবহার করা এমনকি খুন করার কথাও পত্রিকার পাতাতে প্রায়ই দেখা যায়। চিরাচারিত শ্বাশত বাংলাদেশের বাঙালিপনা সামাজিক রীতিনীতি ও আবহে প্রাচীনকাল থেকেই এ দেশের মানুষ মানুষ শান্তিপ্রিয়। কিন্তু দেশ যেখানে সবদিক দিয়ে উন্নতির দিকে যাচ্ছে সেখানে নারী ও শিশুদেরকে যদি সর্বদা অজানা আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়, সেটাওতো কারও কাম্য হতে পারে না। কেননা এ জাতীয় প্রতিটি ঘটনা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের প্রত্যেকের জীবনধারায় যেমন আমৃত্যু দুর্বিষহতা নিয়ে আসে তেমনি সমাজের অন্যদের জীবনেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, যা সামাজিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে।
পৃথিবীর দেশে দেশে আইন করে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ জাতীয় সামাজিক অবক্ষয় রোধ করার জন্য প্রতিটি ঘটনায় অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে শিশু কিশোরী তথা নারীদেরকে রক্ষা করতে চেষ্টা করছে। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে গত ১২ অক্টোবর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২০ চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ১৩ অক্টোবর ২০২০, গেজেট প্রকাশ করা হয়। মামলা শুরু থেকে বিচার শেষ করতে হবে ৬ মাসের (১৮০ দিন) মধ্যে। সম্প্রতি নোয়াখালীতে এক নারীকে নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর থেকে রাজধানীসহ দেশজুড়ে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন থেকে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করার দাবী উঠেছিল সর্বমহল থেকে। ইতিমধ্যে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায় এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে গণধর্ষণের মামলায় ৫ জনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। ১৫ অক্টোবর সকালে টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক খালেদা ইয়াসমীন এ রায় দেন।
তবে বিশ্বায়নের প্রভাবে প্রযুক্তি বাংলাদেশে এত বেশি দ্রুত এগোচ্ছে এবং তার অপব্যবহার হচ্ছে, বিশেষ করে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেইসবুক, টুইটার সহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলোর ভাল কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি অপব্যবহারের মাত্রাও বাড়ছে সাথে সাথে বাড়চ্ছে যৌন নির্যাতনের মত ভয়াবহ সামাজিক অপরাধ। অসুস্থ ওয়েবসাইটের অসুস্থ প্রভাবে (যেমন, পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইটগুলো) মানুষের মধ্যে কিশোরী মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করার একটি প্রবণতার বিকাশ লাভ করছে যা যৌন নির্যাতন বাড়াবে। এছাড়া ভিনদেশী সংস্কৃতির খারাপ দিকগুলো খুব সহজেই আমাদের দেশের কোমলমতী শিশু কিশোর-কিশোরী থেকে বিরাট একটা অংশ নিজেদের লাইফস্টাইলে অর্ন্তভ’ক্ত করে নিচ্ছে। অল্প বয়সে প্রেম-ভালবাসার অলীক সম্পর্কে জড়িয়ে পরিনাম না ভেবে সেক্সকে যেভাবে ফ্যাশন হিসেবে নিচ্ছে একশ্রেণীর কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা, যেভাবে বিয়ে বর্হিভূত সম্পর্ক বা লিভটুগেদার, পরোকিয়ার মত ব্যাপারে নৈতিকতার কোন বালাই মানছে না তাতে সমাজের অবক্ষয়মূলক এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরো নিয়ন্ত্রন করা অসম্ভব ব্যাপার।
এ অবস্থা উত্তরনে মা-বাবাকে শিশুদের প্রতি সর্বদা নজর রাখার পাশাপাশি, কিশোর-কিশোরীদের নৈতিকতা শেখাতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা এ ক্ষেত্রে ভালো একটি উপায় হিসেবে কাজ করে। শিশুকে শেখাতে হবে যাতে সে অন্যদের কাছ থেকে বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়া কোনো খাবার না খায় বা কোনো উপহার বা টাকা পয়সা না নেয় কিংবা কেহ যদি আদর করার উছিলায় বা জোর করে যৌন সম্পর্কিত অঙ্গে স্পর্শ করে তা যেন তার মা-বাবার সাথে সাথে সাথে শেয়ার করে। কিশোর বয়সে ছেলে মেয়েরা যাতে খারাপ কোন কিছুর প্রতি আসক্ত হয় সেদিকে যেমন খেয়াল রাখতে হবে তেমনি তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে। যাতে করে যে কোন ধরনের ভুল বা কোন অবাঞ্চিত পরিস্থিতি সে মা-বাবার সাথে শেয়ার করে, তাতে করে বড় ধরনের বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। নারীরা নির্ভয়ে জীবন গড়তে পারলে তা দেশের জন্য সমাজের জন্য সার্বিক কল্যান বয়ে আনবে। আসুন পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়ে সকলে মিলে একটি আধুনিক সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে যৌন নির্যাতন চিরতরে বন্ধ করি।
লেখকঃ বার্তা সম্পাদক, দর্পণ প্রতিদিন