অনলাইন ডেস্ক :

বাংলাদেশে পড়তে আসা নেপালি ছাত্রীদের নিয়ে অশালীন-আপত্তিকর মন্তব্যের জেরে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন দেশটির আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী শের বাহাদুর তামাং। গতকাল কাঠমাণ্ডুতে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন ডেকে উত্তেজনা ও বিতর্ক ঠেকাতে তিনি তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। কাঠমাণ্ডুতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং দেশটির প্রতিষ্ঠিত সংবাদ মাধ্যম দ্য হিমালয়ান এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। দু’দিন আগে একটি অনুষ্ঠানে নেপালি মন্ত্রী তামাং বলেছিলেন- বাংলাদেশের মেডিকেলে পড়তে যাওয়া নেপালি ছাত্রীরা একটি সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য নিজেদের বিক্রি করে দেয়। তিনি অনেকের কাছ থেকে এটি শুনছেন বলেও দাবি করেন। মন্ত্রীর আপত্তিকর ওই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে পড়ে।
এতে বাংলাদেশ ও নেপাল উভয় দেশে সমালোচনার ঝড় উঠে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকাস্থ নেপালের রাষ্ট্রদূতকে সোমবার তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রীর বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। ঢাকায় থাকা নেপালি শিক্ষার্থী কূটনৈতিক জোনে থাকা নেপাল দূতাবাস ঘেরাও করে গতকাল এবং মন্ত্রীর অশালীন বক্তব্যের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং পদত্যাগের দাবি করে। তারা এ নিয়ে দূতাবাসে একটি স্মারকলিপিও দেয়। কাঠমাণ্ডুতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস গতকাল সন্ধ্যায় মানবজমিনকে বলেন- বাংলাদেশে বর্তমানে নেপালের প্রায় ১৫ শতাধিক মেডিকেল স্টুডেন্ট রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে নেপালি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে মেডিকেল পড়তে যাচ্ছে। কেউই কোনোদিন এমন অভিযোগ তুলেনি। মন্ত্রীর আচমকা এ মন্তব্যে সর্বত্র সমালোচনার ঝড় বইছে। ঢাকার তীব্র অসন্তোষের বিষয়টি আমরা তাদের জানিয়েছি। ঢাকায় রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সমালোচনাটি এমন পর্যায়ে গেছে যে, শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। নেপালের মন্ত্রী শের বাহাদুর তামাং গত রোববার দেশটির একটি এডুকেশন ইনস্টিটিউটে বক্তৃতা করছিলেন। সেখানে তিনি অন্য অনেক বিষয়ে কথা বলেন। এক পর্যায়ে বাংলাদেশে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গ তুলেন। তার বক্তব্যটি ছিল ঠিক এরকম- ‘বাংলাদেশে এমবিবিএস কোর্সে পড়তে যাওয়া নেপালের ছাত্রীরা নিজেকে বিক্রি করে দিয়ে থাকেন। তারা নিজেকে বিক্রি করে একটি সার্টিফিকেট অর্জন করেন।’ স্থানীয় সূত্র মতে, অনুষ্ঠান ও মন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই এ নিয়ে কানাঘুষা শুরু হয়ে যায়। এটি মুহূর্তেই ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় কাঠমাণ্ডুতে। সেই অসন্তোষের ঢেউ আছড়ে পড়ে বাংলাদেশে থাকা নেপালি শিক্ষার্থীদের মাঝে। বাংলাদেশ সরকারও নড়েচড়ে বসে। অবশ্য পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মন্ত্রী সোমবার এ জন্য ক্ষমা চান। তবে তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করেননি। দ্য হিমালয়ানের রিপোর্ট মতে, মন্ত্রী শের বাহাদুর তামাং ক্ষমা চাইতে গিয়ে বলেন- আমার বক্তব্যে কেউ আঘাত বা আহত হয়ে থাকলে ‘ক্ষমা’ চাইছি। মন্ত্রীর এভাবে ক্ষমা চাওয়ায় বিদ্যমান অসন্তোষ না কমে এ আগুন আরো বেড়ে যায়।

 

 

গতকাল দিনভর এ নিয়ে কাঠমাণ্ডুতে বিক্ষোভ হয়। ঢাকায় থাকা নেপালি শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ করে সেই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এখানে তারা দূতাবাস ঘেরাও এবং স্মারকলিপি দেন। নেপালিজ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন্স বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঢাকার নেপাল দূতাবাসে একটি স্মারকলিপি দেয়ার পর সংগঠনের প্রেসিডেন্ট রাজু শাহ গণমাধ্যমকে বলেন- আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে আমরা ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত। একজন মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধি এমন আপত্তিকর কথা বলতে পারেন না। তিনি ইতিমধ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। তবে এই ক্ষমা চাওয়াটাই যথেষ্ট নয়। আমরা তার পদত্যাগ চাই।

নতুন আইনমন্ত্রী নিয়োগ হচ্ছে শিগগিরই: এদিকে কাঠমাণ্ডুভিত্তিক খ্যাতিমান সংবাদ মাধ্যম দ্য হিমালয়ান আইনমন্ত্রী তামাংয়ের পদত্যাগের খবর প্রকাশ করে জানিয়েছে- দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই নতুন আইনমন্ত্রী নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন। পদত্যাগী মন্ত্রী সরকার প্রধানের দেখা করে তার পদত্যাগপত্র জমা দিচ্ছেন এবং এটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সুযোগ নেই। রিপোর্ট মতে, মন্ত্রীর বক্তব্যে দেশটির সরকারেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। জনমনের অসন্তোষ তো আছেই। সোমবার হিমালয়ান মন্ত্রী তামাংয়ের ক্ষমা প্রার্থনার রিপোর্ট প্রকাশ করলেও গতকাল বলেছে মন্ত্রী এ বক্তব্যের জন্য কোনো ক্ষমাই চাননি। বরং তিনি এ নিয়ে উল্টো সমালোচনাকারীদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন। মন্ত্রী ফের উদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন এবং বলেছেন- নেপালের বর্তমান সরকার দেশটির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। কিছু লোক এটি পছন্দ করেন না। তারা সরকারের নামই মুখে নিতে চায় না। তারাই এ ঘটনায় তার ওপর দোষারোপ এবং সমালোচনায় মুখর হয়েছে। মন্ত্রী অবশ্য তার পদত্যাগের সময় সেই অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ান। বলেন- নৈতিক কারণেই আমি পদত্যাগ করেছি।

ফাইল ছবি

বাংলাদেশে ডাক্তারি পড়তে আসা ছাত্রীদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য নেপালি মন্ত্রীর!

বাংলাদেশে ডাক্তারি পড়তে এসে নেপালি ছাত্রীরা তাদের ‘সম্ভ্রম বিক্রি’ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ করেছেন নেপালের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী শের বাহাদুর তামাং।

গত ২০ জুলাই কাঠমান্ডুর চাবাহিলে প্রাজিক্স ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি নামক একটি স্কুলের অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সামনে নেপালের মন্ত্রী এ অভিযোগ করেন। তবে, তিনি এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা পরিসংখ্যান দেন নি।

শের বাহাদুর তামাং দাবি করেন, নেপালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেডিকেল কলেজ না থাকার কারণে অনেক শিক্ষার্থী এমবিবিএস ডিগ্রি নিতে বিদেশে যায়। সেখানে কিছু বিষয়ে তারা সমঝোতা করতে বাধ্য হয়। এ রকম পরিস্থিতিতেও কিছু অভিজাত পেশাজীবী দেশে নতুন মেডিকেল কলেজ খোলার বিরোধীতা করেন। তারা চান না এ পেশায় অন্য আরও লোকজন আসুক।

মন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে নেপালের জাতীয় দৈনিক ‘দি হিমালয়ান’ গত ২২ জুলাই (রবিবার) এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রীর এ ধরনের অভিযোগের নিন্দা করে অনেকেই বলছেন, এ ধরনের অভিযোগ বাংলাদেশে অধ্যয়নরত নেপালি শিক্ষার্থীদের সুনাম ব্যাহত করবে। এ অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন অনেকে।

এর আগে নেপালের বি অ্যান্ড সি মেডিকেল কলেজের নির্বাহী পরিচালক দুর্গা প্রসাই নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে একই ধরনের অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করতে গিয়ে ও এমবিবিএস সার্টিফিকেট পেতে নেপালি শিক্ষার্থীরা ধর্ষিত হচ্ছে কি-না (সেক্সুয়েলি এক্সপ্লোটেড) তা গণমাধ্যম কর্মীদের অনুসন্ধান করা উচিত।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে তিন শতাধিক নেপালি ছাত্রী অধ্যয়ন করছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. আবদুর রশীদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। তবে নেপালের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী যদি এমনটি বলে থাকেন তবে তা গোটা বাংলাদেশের জন্যই দুঃখজনক।’

ওদিকে বিরূপ এই মন্তব্য করার পর চাপের মুখে পদত্যাগ করেছেন নেপালের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী শের বাহাদুর তামাং।

তার এই মন্তব্য নেপালে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বাংলাদেশে পড়তে যাওয়া নেপালি শিক্ষার্থীরা মন্ত্রীর মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানায়।

নেপালি শিক্ষার্থীরা বলেন, কোন ধরনের তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই মন্ত্রী তাদের ব্যাপারে মানহানিকর বক্তব্য দিয়েছেন।

‘তিনি কি কখনো বাংলাদেশে পড়তে যাওয়া নারী শিক্ষার্থীদের কাছে এব্যাপারে খোঁজ নিয়েছিলেন? আমরা সেখানে কতো কষ্ট করে লেখাপড়া করি তার তিনি কিছুই জানেন না,’ বলেন ড. রোজি মানান্ধার, যিনি বাংলাদেশ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে সম্প্রতি নেপালে ফিরে গেছেন।

‘কোন ধরনের প্রমাণ ছাড়াই তিনি একথা বলেছেন। কঠোর পরিশ্রম করেই আমি আমার সার্টিফিকেট পেয়েছি,’ তিনি বলেন।

তবে, ওই অনুষ্ঠানেই মন্ত্রী তামাং বলেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসা কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তিনি এধরনের অভিযোগের কথা শুনেছেন। তবে তিনি এও বলেছেন যে এসব অভিযোগের সত্যতা তিনি নিজে কখনো যাচাই করে দেখেন নি।

বিবিসি জানিয়েছে, নেপালি ওই মন্ত্রী প্রথমে পদত্যাগ করতে চান নি। কিন্তু পরে তার দল ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপালের ভেতরেই তার ওপর প্রচণ্ড রকমের চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে এবং একারণেই শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

মন্ত্রী তামাং এর এই মন্তব্যের কারণে নেপালের সোশাল মিডিয়াতে তার তীব্র সমালোচনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অনেকেই লিঙ্গ বৈষম্যের অভিযোগ তুলে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বিবিসির নেপালি বিভাগকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী তার এই মন্তব্যের জন্যে ক্ষমাও চেয়েছেন।

সিলেটের একটি মেডিকেল কলেজে পঞ্চম বর্ষে পড়ছেন এমন একজন নেপালি শিক্ষার্থী সাব্বু পোখারেল বলেছেন, নেপাল থেকে বাংলাদেশে পড়তে যাওয়া নারী শিক্ষার্থীরা কোন ধরনের চাপের মধ্যে লেখাপড়া করে না।

‘মন্ত্রীর একথা শোনার পর আমার বাবা মা আমাকে ফোন করে এখানকার অবস্থা জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখানকার অবস্থা মোটেও সেরকম কিছু নয়। বাংলাদেশে আমরা খুব নিরাপদে আছি,’ বলেন পোখারেল।