অনলাইন ডেস্ক: অবশেষে উদঘাটিত হয়েছে হবিগঞ্জে বিউটি আক্তার (১৪) হত্যার প্রকৃত ঘটনা। পরিকল্পনা ও খুনের সাথে সরাসরি জড়িত বিউটির বাবা সায়েদ আলী। হত্যার মূলহোতা ময়না মিয়া ও ভাড়াটিয়া খুনির হাতে বিউটিকে তুলে দেন সায়েদ আলী। শনিবার রাতে এ হত্যার আদ্যোপান্ত তুলে ধরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছেন হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা।

বিধান ত্রিপুরা বলেন, বিউটি আক্তার হত্যার দায় স্বীকার করেছেন সায়েদ আলী। শনিবার তিনি নির্বিকারভাবে নিজ সন্তানকে খুনের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য দিয়েছেন আদালতে। শনিবার প্রায় ৫ ঘণ্টা হবিগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-১ তৌহিদুল ইসলামের আদালতে বিউটির বাবার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

এসপি বিধান ত্রিপুরা বলেন, বিউটির ধর্ষণের কথা জানাজানি হওয়ায় বিউটি ও অন্য দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান বাবা সায়েদ আলী। মেয়েকে প্রধান অভিযুক্ত বাবুলের কাছে বিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এরই সুযোগ নেয় তার আত্মীয় ও প্রতিবেশী ময়না মিয়া। ময়না মিয়ার স্ত্রী আছমা বেগম গত ইউপি নির্বাচনে বাবুলের মা কলম চান বিবির কাছে পরাজিত হওয়ায় তার ভেতরে ক্ষোভ কাজ করছিল। এই ক্ষোভ চরিতার্থ করতে সে সায়েদকে প্ররোচিত করে বিউটিকে হত্যা করার। সে বোঝাতে চেষ্টা করে, যেহেতু তোমার মেয়ের ইজ্জত নষ্ট হয়ে গেছে তাই এখন আর কেউ বিউটিকে বিয়ে করবে না। এতে প্ররোচিত হয়ে বিউটিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় সায়েদ। পরিকল্পনা অনুযায়ী ময়না মিয়া ১০ হাজার টাকায় একজন ভাড়াটিয়া খুনি নিযুক্ত করে। এরপর গত ১৬ মার্চ রাত ১০টায় ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের অদূরে একটি বটগাছের নিচে সায়েদ, ময়না ও ভাড়াটিয়া পেশাদার খুনি হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুসারে তারা তিনজন বিউটির নানা বাড়ি লাখাই উপজেলার গুনীপুর গ্রামে যায়। রাত প্রায় সাড়ে ১২টায় সায়েদ আলী নানা বাড়ি থেকে চেয়ারম্যানের কাছে সালিসের কথা বলে নানীর কাছ থেকে বিউটিকে নিয়ে আসে। নানীর বাড়ি থেকে বের করে একই উপজেলার হরিণাকোনা নামক স্থানে ময়না ও ভাড়াটিয়া খুনির হাতে তুলে দিয়ে সায়েদ মিয়া দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। এরপর বিউটিকে খুন করে পাশের খাল থেকে পানি নিয়ে রক্তের দাগ মুছে ফেলে তারা। পরে বিউটির মৃতদেহ কাঁধে বহন করে শেষ রাতের দিকে ব্রাহ্মণডোরা হাওরে লাশ ফেলে রাখে। পরদিনে ১৭ মার্চ সকালে পুলিশ হাওরে পড়ে থাকা বিউটির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে।

তিনি আরো বলেন, গত শুক্রবার রাতে হত্যার মূলহোতা বিউটির আত্মীয় ও প্রতিবেশী ময়না মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তি দেন। ওই দিন একই আদালতে ২১ জানুয়ারিতে সংঘটিত ধর্ষণের অভিযোগ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় হত্যা মামলার প্রধান আসামি বাবুল মিয়া। এদিন নিহত বিউটির নানী ফাতেমা বেগমের স্বাক্ষ্যও গ্রহণ করে আদালত। এছাড়াও তদন্তের জন্য বিউটির মা জোছনা বেগমসহ আরো কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিউটি আক্তার হত্যার ঘটনাপ্রবাহ: শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের সায়েদ আলীর মেয়ে বিউটি আক্তারকে ২১ জানুয়ারি ধর্ষণ করে বাবুল মিয়া। এ ঘটনায় ৪ মার্চ হবিগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে বাবুল ও তার মা কলম চান বিবির বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন সায়েদ আলী। উক্ত মামলায় সাক্ষী করা হয় সায়েদ আলী ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ময়না মিয়াকে। এ ঘটনার পরই বিউটিকে পাঠিয়ে দেয়া হয় লাখাই উপজেলার গুণিপুর গ্রামে নানার বাড়িতে। ১৬ মার্চ রাতে সেখান থেকে নিখোঁজ হয় সে। পরদিন ১৭ মার্চ গুনিপুর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে ছাতাগর্ত হাওরে তার মরদেহ পাওয়া যায়। তার শরীরে ৫টি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পায় পুলিশ। এ ঘটনায় ১৮ মার্চ কিশোরীর বাবা সায়েদ আলী বাদি হয়ে একই গ্রামের বাবুল মিয়া (৩২) ও তার মা ইউপি সদস্য কলম চান বিবিকে (৪৫) আসামি করে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর অভিযান চালিয়ে বাবুলের মা কলম চান বিবি এবং বন্ধু ইসমাইল মিয়াকে অলিপুর থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৩০ মার্চ সিলেট থেকে গ্রেফতার করা হয় বাবুল মিয়াকেও।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেশ বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিবাদের ঝড় উঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ মূল সারির গণমাধ্যমে। ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে। এদিকে পুলিশও হত্যার প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে মরিয়া হয়ে উঠে। প্রথম দফায় তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ারও সুপারিশ করা হয়। বদল করা হয় তদন্তকারী কর্মকর্তা। দ্বিতীয় দফায় চাঞ্চল্যকর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) মানিকুল ইসলাম। দায়িত্ব নেয়ার কয়েকদিনের মাঝেই তিনি রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হন। বাবুল ও তার মা কলম চান বিবিকে রিমাণ্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বিউটির বাবা, মা, মামা, নানীসহ স্বজন ও নিকটাত্মীয়দের।

অবশেষে বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় দায়েরকৃত ধর্ষণ মামলার সাক্ষী ময়না মিয়াকে আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এসব জিজ্ঞাসাবাদেই বেরিয়ে আসে হত্যার রহস্য। শেষ পর্যন্ত ময়না মিয়া হত্যাকাণ্ডে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। প্রকাশ করে জড়িত অন্যান্যদের নামও। হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক তথ্য দেয় সে। অপরদিকে মামলার প্রধান আসামী বাবুল মিয়া হত্যাকাণ্ডে তার সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও আদালতকে জানান। বাবুলের মা ইউপি সদস্য কলম চান বিবিকে ২ দিনের রিমাণ্ড শেষে শুক্রবার রাতে কারাগারে পাঠানো হয়।

উল্লেখ্য, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের সায়েদ আলীর মেয়ে বিউটি আক্তারের মরদেহ ১৭ মার্চ হাওর থেকে উদ্ধার করা হয়।