অনলাইন ডেস্ক : বছর তিনেক আগে রাজধানীর গুলশানে একটি ফ্ল্যাটে জাতীয় পার্টির এক নেতাকে কৌশলে ডেকে নিয়ে এক নারীর সঙ্গে অসামাজিক ছবি তুলতে বাধ্য করে সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র। পরে চক্রের সদস্যরা সেই ছবির মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করে ওই নেতার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। কয়েক দফায় টাকা দেওয়ার পর তিনি অতিষ্ঠ হয়ে বিষয়টি পুলিশকে জানান। শেষ পর্যন্ত প্রতারকদের গ্রেফতারও করেছিল পুলিশ। তিন বছর পর প্রায় একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটল গত রোববার। পূর্বপরিচিত এক নারীর জন্মদিনের পার্টিতে ডেকে নিয়ে বনানী এলাকার একটি ফ্ল্যাটে পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তা মামুন ইমরান খানকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করা হয়। কথিত মডেল ও অভিনেত্রীদের সঙ্গে মামুন ও তার বন্ধু রহমত উল্লাকে ছবি তুলতে জোরাজুরি করা হয়। তাতে বাধা দিলে মামুনকে হত্যা করে লাশ গাজীপুরে নিয়ে গুম করে ব্ল্যাকমেইল পার্টির দুর্বৃত্তরা।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, মামুন হত্যায় জড়িতরা পেশাদার প্রতারকচক্রের সদস্য। অভিজাত এলাকায় আস্তানা গাড়ছে তারা। বাসা ভাড়া নিয়ে কথিত মডেল ও অভিনেত্রীদের ব্যবহার করে টার্গেট করা ব্যক্তিদের ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় করা এই চক্রের কাজ। তাদের মূল কৌশল হলো- চেয়ার-টেবিলসহ সামান্য আসবাবপত্র ছাড়া ভাড়া বাসায় তারা কখনোই বেশি কিছু তোলে না। কিছু দিন পরপর বাসা বদলায়।

বনানীর ২/৩ নম্বর সড়কের যে ফ্ল্যাটে মামুনকে হত্যা করা হয়েছে, সেটি গত মে মাসে ভাড়া নেয় জনৈক নজরুল ইসলাম। মাসে ৪৫ হাজার টাকায় ১৬০০ স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেওয়া হয়। ওই ফ্ল্যাটে একটি তোশক, তিনটি চেয়ার ও একটি টেবিল ছাড়া কিছুই নেই। ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় এরই মধ্যে মালিক ভাড়াটিয়াকে ফ্ল্যাট ছাড়তে নির্দেশ দেন।

ধারণা করা হচ্ছে, দ্বিতীয় সারির উঠতি নারী মডেলদের ব্যবহার করে টার্গেট করা ব্যক্তিদের ফাঁসাতেই ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নেন নজরুল ইসলাম। তিনি ব্ল্যাকমেইল চক্রের মূল হোতা। এই চক্রের অন্য সদস্যরা হলো- দিদার, রবিউল, শেখ হৃদয়, আতিক, মিজান, রহমত উল্লাহ, সুরাইয়া আক্তার রেখা ওরফে কেয়া, মেহেরুন নেসা স্বর্ণা ওরফে আফরিন ও ফারিয়া বিনতে মীম ওরফে মাইশা। তাদের মধ্যে আফরিন ও রহমত উল্লাহর সঙ্গে মামুনের আগে থেকে পরিচয় ছিল। কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশনে অপরাধবিষয়ক অনুষ্ঠানে মামুন ও আফরিন অভিনয় করেছিলেন। গত রোববার আফরিনের জন্মদিনের কথা বলেই বনানীতে মামুনকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। আর রহমত উল্লাহ ছিলেন মামুনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

বনানীর ওই বাসার নিরাপত্তারক্ষী মিরাজ জানান, প্রায়ই ওই ফ্ল্যাটে অচেনা লোকজন আসতেন। শেখ হৃদয় নামে একজনের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে এক নারী প্রায়ই সেখানে যেতেন। ওই ফ্ল্যাটে মিডিয়ার অফিস, বায়িং হাউস ও বৃদ্ধাশ্রম খোলার কথা জানিয়েছিল ভাড়াটিয়া পক্ষ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পূর্ব বিভাগের ডিসি খোন্দকার নুরুন্নবী  বলেন, মামুন হত্যায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। সোমবারের মধ্যে তদন্তে আরও অগ্রগতি হবে।

এর আগে রাজধানীর দক্ষিণখানের পশ্চিম ফায়দাবাদে অশ্নীল ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করে চাঁদা আদায়কারী চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। তারা হলো- খায়রুল আলম, পান্নু মিয়া, সাইফুল ইসলাম নিলয়, খাইরুল ইসলাম মনির, শামীমা আক্তার ও তাসনিন ইভা। তাদের কাছে হ্যান্ডকাফ, তিনটি পুলিশের ভুয়া আইডি কার্ড, একটি ক্যামেরা, আপত্তিকর ছবি উদ্ধার করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে ওই চক্রও রাজধানীর অভিজাত এলাকায় প্রতারণা করে আসছিল। বিভিন্ন ব্যক্তিকে টার্গেট করে কৌশলে মোবাইল নাম্বার আদান-প্রদান করে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলত। এরপর বাসায় ডেকে আপত্তিকর ছবি তুলে তা ব্যবহার করে প্রতারণা করত চক্রের সদস্যরা। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কর্মকর্তা মামুনও একই ধরনের প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়েন।

গত রোববার সন্ধ্যার পর থেকে মামুন নিখোঁজ ছিলেন। এ ঘটনায় পর দিন সবুজবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন তার ভাই। নিখোঁজ মামুনের সন্ধানে তদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশ জানতে পারে, আফরিনের জন্মদিনের পার্টির কথা বলে মামুনকে বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার একটি বাসায় ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে সেই নারীর উপস্থিতিতে তার সাঙ্গোপাঙ্গরা মামুনকে হত্যা করে। ঢাকায় লাশ গুম করতে না পেরে তারা গাজীপুরের কালীগঞ্জ থানার উলুখোলা রাইরদিয়ায় নির্জন এলাকায় লাশবাহী গাড়ি পার্ক করে। তার আগে তারা একটি পাম্প থেকে পেট্রোল কিনে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে গাজীপুরের কালীগঞ্জে নিয়ে একটি জঙ্গলে বস্তাবন্দি করে লাশ ফেলে আসে। গত মঙ্গলবার মামুনের লাশ উদ্ধারের পর স্বজনরা বেল্ট ও প্যান্ট দেখে লাশ শনাক্ত করেন।

২০০৫ সালে উপপরিদর্শক হিসেবে পুলিশে যোগ দেন মামুন। ২০১৫ সালে পদোন্নতি পেয়ে পরিদর্শক হন তিনি। চাকরির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন নাটক ও টেলিফিল্মে অভিনয় করতেন। অভিনয় করতে গিয়েই দ্বিতীয় সারির অভিনেত্রী আফরিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।