অনলাইন ডেস্ক :
বাসার টেবিলে থরে থরে সাজানো আছে বই। বৃহস্পতিবার ক্লাসে সহপাঠীদের উপস্থিতিও ছিল সরব। শুধু ছিল না ক্লাসের মেধাবী ছাত্রী ইলহাম বিনতে নাছির (১২)।
বুধবার সকালে নিজ বাসায় গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় মেধাবী এ ছাত্রীকে। ইলহাম নগরীর মেরন সান স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। ক্লাসে রোল ৩।
নগরীর বাকলিয়া থানাধীন সৈয়দশাহ রোডের ল্যান্ডমার্ক সোসাইটির এমএস লায়লা ভবনের ৬ষ্ঠ তলায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ইলহাম হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। চুরি-ডাকাতি করতে গিয়ে পেশাদার অপরাধীরা তাকে হত্যা করেছে, নাকি পারিবারিক বিরোধের বলি- এ দুটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে।
এ প্রসঙ্গে নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হত্যার কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। আমরা আশাবাদী, শিগগির হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারব।’
বাকলিয়া থানা পুলিশের পাশাপাশি হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), সিআইডি এবং নগর গোয়েন্দা পুলিশও ছায়া তদন্ত করছে।
এ ঘটনায় পুলিশ সাতকানিয়া উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শিকু আরা বেগমের ছেলে শিক্ষানবিশ আইনজীবী রেজোয়ান সিদ্দিকী রাজুকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
এ ছাড়া নিহত শিশুর মা নাসরিন আকতার খুশবুকেও পুলিশ কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ইলহামকে বুধবার রাতে ময়নাতদন্ত শেষে সাতকানিয়া উপজেলার পশ্চিম ঢেমশা এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মামলা হয়নি। নিহতের নানা নাছির উদ্দিন থানায় মামলা করবেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শিশুটির মা নাসরিন আক্তার বলেন, বুধবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে দ্বিতীয় মেয়ে জেরিন তাসলিমকে নিয়ে স্কুলে যান তিনি।
এ সময় তিনি ইলহামকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলেন। তবে মেয়েকে পৌঁছে দিয়ে কাঁচাবাজার নিয়ে ৯টার দিকে বাসায় ফিরে দরজা খোলা দেখতে পান।
ভেতরে ঢুকে দেখতে পান, বাসার একেবারে দক্ষিণের রুমে ইলহাম শুয়ে আছে, মুখের ওপর বালিশ। বালিশ সরাতেই দেখতে পান, ইলহামের গলা কেটে রাখা হয়েছে।
তিনি চিৎকার করে উঠলে সামনের ফ্ল্যাট থেকে তার ছোট দেবরের শ্যালক রেজোয়ান সিদ্দিকী রাজু দৌড়ে ওই বাসায় যান। রক্তাক্ত অবস্থায় ইলহামকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থল এমএস লায়লা ভবনে গিয়ে দেখা গেছে স্বজনদের আহাজারি। দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়রা ইলহামের মা-দাদিসহ অন্যদের আহাজারি থামানোর চেষ্টা করছেন। ভবনটি তাদের নিজস্ব। ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলায় ইলহাম ও তার চাচারা থাকেন। প্রথম থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত থাকেন ভাড়াটিয়ারা। ইলহামের বাবা নাছির আহমেদ থাকেন সৌদি আরবে।
বাসায় নাসরিন আকতার তার তিন সন্তান ও শ্বাশুড়িকে নিয়ে থাকতেন। নাছির আহমেদের অপর তিন ভাই ছাবের আহমেদ, আবদুল শুক্কুর ও জাফর আহমেদও সৌদি আরব প্রবাসী।
দুপুর দেড়টার দিকে নগর গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি (ডিবি) হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব চৌধুরীসহ পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে নিহতের মা নাসরিন আকতারসহ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলে।
এদিকে প্রবাসী ছাবের আহমেদের স্ত্রী ফাতেমা আকতার জোৎস্নাও থাকতেন বাসায় একা। এ কারণে ছোট ভাই শিক্ষানবিশ আইনজীবী রেজোয়ান সিদ্দিকী রাজু ওই বাসায় থাকতেন। ঘটনার পরপরই রাজু ইলহামকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
এ প্রসঙ্গে রেজোয়ান সিদ্দিকীর মা সাতকানিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শিকু আরা বেগম যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ বুধবার বিকালে আমার ছেলেকে আটক করে নিয়ে গেছে। তাকে কোথায় রাখা হয়েছে, কেন নিয়ে গেছে সে বিষয়ে আমাদের কিছুই জানায়নি। এ জন্য আমরা চিন্তিত।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ বলছে, আমার ছেলের (রেজোয়ান) সঙ্গে নাকি নিহত ইলহামের মা নাসরিনের সম্পর্ক আছে। এ সূত্রে ইলহাম খুন হয়েছে।
রেজোয়ানকে বিষয়টি স্বীকার করানোর জন্য পুলিশ চাপ দিচ্ছে। পুলিশ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার না করে ঘরের লোকজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।’
বাসায় উপস্থিত স্বজনদের দাবি, এমএস ভবনে গত এক বছরে কয়েকবার চুরি হয়েছে। চুরির অভিযোগে বাকলিয়া থানায় একটি অভিযোগও তারা আগে করেছিল। বাসার দরজা খোলা পেয়ে চোরের দল বাসায় ঢুকে মালামাল নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দেয়ায় ইলহামকে খুন করা হতে পারে।