অনলাইন ডেস্ক : সেনা অভিযানের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন রোহিঙ্গা নারীরা। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বিবাহিত। অনেকে ক্যাম্পে এসে বিয়ে করে থিতু হয়েছেন। আশা ছিল, নির্যাতনের স্মৃতি ভুলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। সংসার পাতবেন। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো। সংসারের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে স্বামীর প্রতারণায়। রোহিঙ্গা পুরুষদের বহুবিবাহ ও প্রতারণার প্রবণতায় বিদেশ-বিভুঁইয়ে এসে ক্রমেই একা হয়ে পড়ছেন ক্যাম্পের নারীরা। বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নির্যাতনের প্রবণতাও।
পাঁচ সন্তানের জননী সারা খাতুনের বসবাস কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। সেনা অভিযানের সময় গণধর্ষণের শিকার হয়ে স্বামী-সন্তানসহ পালিয়ে এসেছিলেন। তবে ক্যাম্পে এসে আরেক নারীকে বিয়ে করে স্বামী তাকে ছেড়ে গেছেন। এখন পাঁচ সন্তানের ভরণ-পোষণসহ নিজের বাকি জীবন কাটানোটা তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তার ভাষায়, ‘আমি যদি অবিবাহিত হতাম, তবে এমন পরিস্থিতিতে কখনই বিয়ে করতাম না।’
২০ বছর বয়সী রহিমার বিয়ে হয় ক্যাম্পে এসে। পরে তার স্বামী চাকরি জুটিয়ে চট্টগ্রামে থিতু হন। সেখানেই আরেক রোহিঙ্গা নারীকে বিয়ে করে সংসার পেতেছেন। সন্তানসম্ভবা রহিমার ঠাঁই হয়েছে ক্যাম্পের ঝুপড়িতে। তিনি বলেন, আমি জানি না, কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেল। কয়েক সপ্তাহ আগে আমি তাকে ফোন করেছিলাম। আমাকে চিনতেই পারল না।’ সারা কিংবা রহিমার মতো অনেক নারী ক্যাম্পগুলোয় একা বসবাস করছেন। তাদের অনেকেই সন্তান জন্ম দেয়ার অপেক্ষায়। অনেকেই নিজের ও সন্তানদের পেট চালানোর জন্য একা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তু কেন রোহিঙ্গা পুরুষদের মধ্যে এমন প্রতারণার মানসিকতা দেখা দিয়েছে? উত্তরটা জানালেন স্থানীয় উন্নয়নকর্মী তাসলিয়া আকতার। তার মতে, মিয়ানমারে থাকার সময় একাধিক বিয়ের সুযোগ সীমিত ছিল। একাধিক বিয়ে করলে তাদের আইনগত শাস্তি পেতে হতো। এখন এ সুযোগ থাকায় রোহিঙ্গা পুরুষরা একের অধিক বিয়ে করছেন। আর আগের স্ত্রীদের ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করছেন। এছাড়া অনেকেই ক্যাম্পের বাইরে চাকরি নিয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রী-সন্তানদের ছেড়ে যাচ্ছেন। পরে আরেকটি বিয়ে করে নতুন সংসার পাতছেন। এমন অনেক রোহিঙ্গা পুরুষ আছেন, যারা একই ক্যাম্পে ছয়টি বিয়ে করেছেন।
স্বামী পরিত্যক্তা রোহিঙ্গা নারীদের অনেকেই বিষয়টিকে ‘নিজেদের মন্দভাগ্য’ বলে মেনে নিয়েছেন। স্বামীর নতুন বিয়েতে বাধা দেয়ার কারণে ক্যাম্পগুলোয় লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনাও আগের তুলনায় বেড়েছে। পারিবারিক সহিংসতার শিকার অনেক রোহিঙ্গা নারী চিকিৎসা নিয়েছেন। স্বামী পরিত্যক্তা রোহিঙ্গা নারীদের সহায়তার জন্য ক্যাম্পে সহায়তা কেন্দ্র খুলেছে কিছু এনজিও।
এমনই একটি কেন্দ্রে কাজ করেন খাতুন নামের ৪৫ বছর বয়সী এক নারী। তিনি বলেন, ‘গতকাল আমি স্বামীর দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত একজন রোহিঙ্গা নারীকে দেখেছি। স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে বাধা দেয়ায় তাকে চরমভাবে আহত করা হয়েছে। এখন ওই নারী একা বাইরে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন।’
রোহিঙ্গা নারীদের বিয়ে হয় খুবই কম বয়সে। ১২-১৫ বছর বয়সের মধ্যে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তারা একাধিক সন্তান জন্ম দেন। অল্প বয়সে সন্তানসহ স্বামী পরিত্যক্তা এসব নারী ক্যাম্পগুলোয় দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। ক্যাম্পের জনাকীর্ণ পরিবেশেও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্তানদের পেট চালানোর দায়িত্বও।