গনেশ চন্দ্র হাওলাদার :

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ও প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। – ‘দ’ অর দৈত্যনাশক, উ-কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ অর পাপনাশক ও অ-কার ভয়-শত্রুনাশক। অর্থাৎ, দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। তিনি সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি। শারদীয় দুর্গা পূজায় দেবীকে মহাশক্তির একটি উগ্র রূপ মনে করা হয়। জগতের দেবী দুর্গার দশ হাত। তাঁর বাহন সিংহ। মহিষাসুরমর্দিনী-মূর্তিতে তাঁকে মহিষাসুর নামে এক অসুরকে বধরত অবস্থায় দেখা যায়। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে তিনি শিবের স্ত্রী পার্বতী, কার্তিক ও গণেশের জননী, এবং কালীর অন্যরূপ।

আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষে এবং চৈত্রমাসের শুক্ল পক্ষে দুর্গোৎসব পালন করা হয়ে থাকে। বসন্তকালের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা ও শরৎকালের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। বাংলাদেশ সহ পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, নেপাল ও পাশ্চাত্য, মধ্যপ্রাচ্য ও দণি-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশগুলিতে বাঙালিরা কর্মসূত্রে অবস্থান করেন, সেখানেও মহাসমারোহে দুর্গোৎসব পালিত হয়ে থাকে। দুর্গার আরাধনা বাংলা, অসম এবং বিহারের কোনো কোনো অঞ্চলে প্রচলিত। ভারতের অন্যত্র দুর্গাপূজা নবরাত্র উৎসব রূপে উদযাপিত হয়। এই কারণে সারা বিশ্বের কাছেই বর্তমানে বাংলার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে শারদীয় দুর্গোৎসব।

সনাতন হিন্দু ধর্মের শাস্ত্রগ্রন্থের বর্ননা ও বিশ্বাসমতে সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা কৃষ্ণ বৈকুণ্ঠের আদি-বৃন্দাবনের মহারাসমন্ডলে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। এরপর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে ব্রহ্মা দ্বিতীয় দুর্গাপূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামে এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শিব বিপদে পড়লে তৃতীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র যে পূজার আয়োজন করেছিলেন, সেটি ছিল চতুর্থ দুর্গাপূজা। কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাঁদের পূজা যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে তাই এই পূজার নাম হয় “অকালবোধন”। এই দুই পুরাণ অনুসারে, রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর রামায়ণে লিখেছেন, রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। এরপর থেকেই পৃথিবীতে মুনিঋষি, সিদ্ধপুরুষ, দেবতা ও মানুষেরা নানা দেশে নানা সময়ে দুর্গাপূজা করে আসছে।

শাস্ত্রীয় মতে দুর্গাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস; মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তম্যাদিকল্পারম্ভ, সপ্তমীবিহিত পূজা; মহাষ্টমীতে মহাষ্টম্যাদিকল্পারম্ভ, কেবল মহাষ্টমীকল্পারম্ভ, মহাষ্টমীবিহিত পূজা, বীরাষ্টমী ব্রত, মহাষ্টমী ব্রতোপবাস, কুমারী পূজা, অর্ধরাত্রবিহিত পূজা, মহাপূজা ও মহোৎসবযাত্রা; সন্ধিপূজা ও বলিদান; মহানবমীতে কেবল মহানবমীকল্পারম্ভ, মহানবমী বিহিত পূজা; বিজয়াদশমীতে বিজয়াদশমী বিহিত বিসর্জনাঙ্গ পূজা, বিসর্জন, বিজয়াদশমী কৃত্য ও কুলাচারানুসারে বিসর্জনান্তে অপরাজিতা পূজা। এছাড়াও পত্রপত্রিকার পূজাসংখ্যা প্রকাশ, পরিক্রমা, শারদ পুরস্কার বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শাস্ত্রীয় সংগীতানুষ্ঠান, শিল্পপ্রদর্শনী ও সমাজসেবামূলক কাজকর্ম এ উপলক্ষে হয়ে থাকে। বর্তমানে পূজায় “থিম” বা নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক মন্ডপ, প্রতিমা ও আলোকসজ্জা উৎসবের আনন্দকে বহুগুনে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বাংলায় দুর্গোৎসব প্রবর্তিত হয়। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পরে ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে “দুর্গাষষ্ঠী”, “মহাসপ্তমী”, “মহাষ্টমী”, “মহানবমী” ও “বিজয়াদশমী” নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় “দেবীপক্ষ”। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। বাংলাদেশে বিজয়া দশমী সরকারি ছুটির দিন।

দুর্গাদেবীর আবাহন তথা মহালয়ার মধ্য দিয়ে ৮ অক্টোবর শুরু হয়েছে দেবীর আরাধনা। এবছর বাংলাদেশে ১৫ অক্টোবর সোমবার “দুর্গাষষ্ঠী” মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠিকতা শুরু হয়ে ১৬ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৭ অক্টোবর মহাঅষ্টমী ও কুমারী পূজা, ১৮ অক্টোবর মহানবমী এবং ২৯ অক্টোবর শুক্রবার “বিজয়াদশমী”র মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গাপূজার নানা আনুষ্ঠিকতা মহাসমারোহে পালিত হবে।

সারাদেশে ১৯ অক্টোবরই বিজয়া শোভাযাত্রা সহকারে প্রতিমা বিসর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বরাবরের মতো এবারও পাঁচ দিনজুড়েই চলবে উৎসবের নানা আয়োজন। সনাতন বিশ্বাস ও পঞ্জিকা মতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসবেন। আর বিদায় নেবেন (গমন) দোলায় (পালকি) চড়ে।

বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গা পূজা সার্বজনীন উৎসবে পরিনত হয়। কেননা ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে শারদীয় দুর্গাৎসবে অংশগ্রহন করে অনাবিল আনন্দে মেতে ওঠে বাংলার সকল নারী পুরুষ। এবার সারাদেশে ৩১ হাজার ২৭২টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে। যা গতবারের তুলনায় ১৯৫টি বেশি। আর ঢাকা মহানগরীর এবারের পূজামণ্ডপের সংখ্যা ২৩৪টি, যা গত বছরের তুলনায় ৪টি বেশি। মন্দির-মন্ডপ গুলোতে প্রতিমা নির্মাণ, প্যান্ডেল-মঞ্চ স্থাপন, সাজসজ্জাসহ সেই প্রস্তুতি অনেকটা এগিয়েও গেছে। সর্বত্রই যেন সাজ-সাজ রব।

মানুষের ভক্তি বা গুণ অনুযায়ি কর্মফল ভিন্ন হয়ে থাকে। তথাপী যে যেভাবে দেবীকে আরাধনা করে সে সেভাবেই দেবীর আশীর্বাদ পেয়ে থাকে। ধরাতলে দেবীর নানারূপের প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতিগতভাবে দেবী ধরাতলের সমগ্র জীবসমূহের মধ্যে চলাচল করছেন। তিনি ব্রহ্মার লয়কারিণী কালরাত্রি, জগতের লয়কারিণী মহারাত্রি এবং মানুষের লয়কারিণী ভয়ঙ্করী মোহরাত্রী। দেবী বিশ্বেশ্বরী, তাই সমগ্র বিশ্বকে রক্ষা করছেন। তিনি জগৎরূপা, তাই সমগ্র জগৎকে ধারণ করছেন। দেবী ব্রহ্মা, ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণের আরাধ্য। তাঁতে যে যেভাবে, যে গুণেই ভক্তিভাব প্রদর্শন করে তারা সেভাবেই তাঁর আশ্রয় হয়ে থাকেন।

লেখক সাংবাদিক ও কলামিস্ট