গনেশ চন্দ্র হাওলাদার :
জন্মস্থানের সবকিছুই সবার মননজগতে অত্যন্ত তীব্রতার সাথে ভাস্কর হয়ে থাকে। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে আমার জন্মস্থান এমন এক জনপথে যা কিনা দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বহি:বিশ্বে¦ও সমধিক পরিচিত। প্রকৃতির এক অপূর্ব সমারোহ সাগর বিধৌত সাগরকন্যা কুয়াকাটা তথা কলাপাড়া উপজেলা।
জন্মস্থান কতটা প্রিয় তা পুরোপুরি টের পাওয়া যায় তখনই যখন আমরা স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্য জন্মস্থান ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করি। এইচএসসি পাশ করার পর অন্য আরও অনেকের মত উচ্চ শিক্ষার আশা নিয়ে রাজধানী শহর ঢাকাতে আসাটাকে সেসময় বিশেষ সুযোগ মনে হলেও পড়াশুনা শেষ করেও সময়ের প্রয়োজনে পেশাগত ও পারিবারিক জীবনে আবদ্ধ থেকে কংক্রিটের এই কৃত্রিম তিলোত্তমা নগরীতে ছাব্বিশটি বছর কেটে গেছে ঠিকই কিন্তু জন্মস্থান কলাপাড়ার অকৃত্রিম ভাললাগা ভালবাসায় পরিপূর্ণ জীবনের প্রথম আঠারটি বছরের প্রতিটি মুহুর্তই এখনও মনন জগতে তীব্র ভাবাবেগের জন্ম দেয়।
কলাপাড়া থানার উপকন্ঠে চিংগড়িয়া গ্রামের অকৃত্রিম প্রাকৃতিক পরিবেশে কাটানো আঠারটি বছরের সেই সোনালী অধ্যায় লেখনীতে ফুটিয়ে তোলা দুস্কর এবং সময় সাপেক্ষ তাই সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রিয় গাজী মিজানুর রহমান ভাই যখন ”কলাপাড়া সমিতি, ঢাকা” এর স্যুভিনির এর জন্য কলাপাড়ার স্মৃতিচারণ মূলক লেখা লিখতে বললেন তখন আমার জন্মস্থান এর সবচেয়ে আকষর্ণীয় স্থান সুর্যোদয় ও সুর্যাস্ত দেখার বিরল সমুদ্র্র সৈকত কুয়াকাটায় প্রথম ভ্রমন তথা পূণ্য স্নান এর স্মৃতি নূতন করে স্মরণ করার প্রয়াস পেলাম।
বর্তমানে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যোগাযোগের জন্য খুব ভাল মানের সরাসরি বাস সার্ভিস এবং বরিশাল কিংবা পটুয়াখালী হয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও আরামদায়ক লঞ্চ ও পরবর্তীতে পিচ ঢালা প্রশস্ত সড়কে বাস, মাইক্রো বাস সহ নানাবিধ ব্যবস্থায় কুয়াকাটায় পৌঁছে থাকা খাওয়ার জন্য পর্যটন কর্পোরেশনের অত্যাধুনিক মোটেল সহ আর্ন্তজাতিক মানের অনেক গুলো হোটেল মোটেল ও অন্যান্য নানাবিধ সুবিধা থাকলেও আশির দশকের শুরুতে আমার প্রথম কুয়াকাটা যাত্রায় কলাপাড়া থানা ছিল প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ছোঁয়া বঞ্চিত। কলাপাড়া থানা শহর থেকে থেকে কুয়াকাটা যাওয়াটা ”দুর্গম গিরি কান্তার মরু” পার হওয়ার মত অবস্থা ছিল।
আমি যখন প্রথম মনে করার মত বয়সে কুয়াকাটা যাওয়ার সুযোগ পাই সেসময় আমার বয়স মাত্র সাত বছর। সাগর সৈকতের শোভা সে সময় খুবই মনোমুগ্ধকর ছিল, সমুদ্রতট বা সৈকত ছিল অনেক অনেক বেশি প্রশস্ত, দেখার মত অনেক প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী থাকলেও সেসময় তা উপভোগ করার মত মানসিক পূর্ণতা বয়সের কারনেই আমার ছিল না। বরং রাস পূর্ণিমা তিথির সকালে নির্দিষ্ট মুহুর্তে সাগরে স্নান করলে পিছনের সব পাপ দুর হয়ে যায়, আমার নিজ সম্প্রদায় সনাতন ধর্মের সে বিশ্বাস থেকে পূণ্য স্নান এর জন্যই মূলতঃ পরিবারের সাথে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার প্রথম সুযোগ হয়েছিল।
সময়টা ছিল কার্তিক মাসের শেষ কিংবা অগ্রহায়ন মাসের শুরুর কোন দিন । খুব সকালে কলাপাড়া থানা শহরের উপকন্ঠ চিংগড়িয়ার বাসা থেকে বাবা-মা, জেঠিমা-জেঠা মহাশয় এবং বড় ভাই-বোন সহ সাত জনের দলটি যাত্রা শুরু করেছিলাম। প্রকৃতিতে শীতের প্রকোপ ভালভাবেই বিরাজমান ছিল। কখনও পদব্রজে কখনও বাবা-মায়ের কোলে চড়ে মাত্র ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ যেন ফুরোতেই চাচ্ছিল না। সকাল থেকে রাত অবধি নিরন্তর হেঁটে চলা আর দুই-তিন কিলোমিটার অতিক্রম করার পরে কোন গাছের ছায়ায় জিরিয়ে নেয়া।
কলাপাড়া শহরের কোল ঘেষে বয়ে চলা আন্ধারমানিক নদী পার হয়ে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত পুরো রাস্তাটিই ছিল মাটির কাঁচা রাস্তা। অপ্রশস্ত জীর্ন রাস্তাটি মাঝে মাঝেই বড় বড় গর্ত ও ভাঙ্গা ছিল। যানবাহন বলতে তেমন কিছুই ছিল না। তবে শীতকাল হওয়ায় চলাচলে কিছুটা সুবিধা হলেও ধুলার দাপট আর রৌদ্রের ক্রমবর্ধমান তাপে মাঝে মাঝেই হাঁপিয়ে যেতে হচ্ছিল। সাথে চিড়া-মুরি-গুড় জল থাকায় এবং পথে পাখিমারায় সড়কের পাশেই নিজেদের গ্রামের প্রায় জঙ্গলাকৃর্ন বাড়ি ছাড়াও আগে-পড়ে মামাবাড়ি-পিসিবাড়ি সহ অনেক আত্মীয় স্বজনের বাড়ি থাকায় খাওয়া নিয়ে খুব একটা দুর্ভোগে পড়তে হয় নি। এছাড়া আমাদের মত আরও অনেক ছোট-বড় পূণার্থী দল একই ভাবে কুয়াকাটায় যাচ্ছিল বিধায় একটা উৎসব মুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল। আমার বাবা-জেঠা সত্তরের প্রলংঙ্করী জলোচ্ছাসে সব কিছু ভাসিয়ে নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাঁদের যৌবনের বার বছর কুয়াকাটা এলাকায় ব্যবসা সূত্রে বসবাস করেছিলেন বলে তাদের কাছেও পরিবার নিয়ে কুয়াকাটা যাত্রাটা ছিল খুবই আনন্দের।
যাত্রপথে মোট তিনটি নদী যা কিনা খেয়া নৌকায় পার হতে হয়েছিল। নৌকায় উঠতে এবং অপর পাড়ে নেমে কর্দমাক্ত এঁটেল মাটির বেশ অনেকটা পথ অতিক্রম করাটা খুব একটা সুখকর ছিল না, বিশেষ করে শেষ নদী পাড় হওয়ার সময় রাত্রি হয়ে গিয়েছিল। শীতকালের নদীর জল ছিল খুবই লবনাক্ত আর ঠান্ডা। কুয়াকাটা তথা আশে পাশের এলাকাই ছিল লবনাক্ততায় পরিপূর্ণ। সুপেয় পানির জন্য দু-একটা গভীর নলকূপ থাকলেও কুয়া খনন কিংবা পুকুরের পানি মাটির কলশিতে ফিটকিরি ব্যবহারে পানযোগ্য করার প্রচলন হত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।
কখনও পদব্রজে কখনও বাবা-মায়ের কোলে চড়ে শেষ না হওয়া দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে স্নানের পূর্ব রাত্রিতে পূর্ণিমা তিথির মায়াময় আলোতে সমুদ্রের সো সো আওয়াজ কয়েক মাইল পূর্ব থেকে শুনতে শুনতে হাজির হয়েছিলাম আশির দশকের কুমারী কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে। কনকনে হিমেল হাওয়া আর দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি দূর হয়ে গিয়েছিল সমুদ্রের গর্জন আর বিশালতায়। জ্যোৎ¯œালোকের সিন্ধতায় সামনে অসীম জলরাশি আর সৈকতে বালির রাজ্যে অসংখ্য ঝোঁপ ঝাড়ে শত শত মানুষের ফিসফাস আওয়াজের মাঝে ফাঁকা উপযুক্ত স্থান খুঁজে চাদর বিছিয়ে সৈকতের কাছাকাছি রাত্রি কাটানোর সে অভিজ্ঞতা বর্ননাতীত।
শীতের তীব্রতার হাত থেকে বাঁচার জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ কুয়াকাটা বৌদ্ধ মন্দিরের চারপাশ ঘিরেই বেশিরভাগ পূণার্থী মানুষের ন্যায় আমরাও রাত কাটিয়েছিলাম। কুয়াকাটায় তখন সর্বত্রই ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইনদের ব্যাপক উপস্থিতি। বাবা-মা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ন এবং বাবা ছিলেন সুকন্ঠী ও সংগীতজ্ঞ মানুষ। দোতরা ছিল তাঁর প্রিয় বাদ্য যন্ত্র। দোতরা বাজিয়ে ধর্মীয় সংগীতের মাঝে ডুবে যাওয়াটাই ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের প্রাত্যহিক অভ্যাস। জেঠা-জেঠিমাও অত্যন্ত ধর্মপরায়ন এবং সংগীতজ্ঞ ছিলেন। পূণ্য স্নান পূর্ব রাতে বাবা, জেঠা-জেঠিমা ধর্মীয় গান শুরু করার সাথে সাথে চারপাশের পূণার্থীগণ আমাদের কাছে এসে জড়ো হতে শুরু করেন এবং তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই এবং আমার মা গানের সাথে গলা মিলাতে থাকেন। গভীর রাত পর্যন্ত চলেছিল সমুদ্র সৈকতের জ্যোৎ¯œালোকের সেই ধর্মীয় সংগীত। আমরা তিনভাই বোন কখন ঘুমিয়ে পড়েছি তা বলতে পারব না, ভোর রাতে বাবা-মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গলে দেখলাম আধো অন্ধকার আধো আলোতে ভোরের আকাশ ক্রমশঃ ফর্সা হচ্ছে। চারদিকে মানুষের জেগে ওঠার শব্দ ছাড়িয়ে সমুদ্রের গর্জন।
সুর্যোদয়ের পূর্বেই আমরা বালুতট অতিক্রম করে কুয়াকাটা ঘাট বরাবর সমুদ্রের মূল অংশে পৌঁছে গেলাম। ততক্ষনে চারদিকে আরও অনেক পূণার্থী মানুষের ভীড়। ধর্মীয় মন্ত্রপাঠের মধ্যে দিয়ে সনাতন ধর্মের বিশ্বাস মতে পাপ মোচন ও পূণ্য লাভের অসীম আশা নিয়ে জীবনের প্রথম সমুদ্রে ডুব দিলাম। তবে কতক্ষন সমুদ্রের সান্নিধ্যে কাটিয়েছিলাম এতবছর পরে তা আর মনে করতে পারছি না। তবে শুদ্ধতার চেতনায় হৃদয় মন পূর্ণ হয়েছিল। তখনকার জানায় সাগরের এ অংশটাই ছিল পৃথিবীর এ অংশের শেষ সীমানা, তাই বিশাল জলরাশিতে অবগাহন করে ক্ষুদ্র হৃদয়ের সমস্ত গ্লানি মুছে পবিত্রতার সিগ্ধতায় নতুন করে নিজেকে আবি¯কার করেছিলাম। সমুদ্রের বুকে সোনালী আভায় সুর্য্য দেবের উদিত হওয়াটাও ছিল তখন ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকে অত্যন্ত মাধুর্যময়।
শত শত পূণ্যার্থী নারী-পুরুষ সমুদ্রের হাঁটুজলে দাড়িয়ে আমাদের মতই ধর্মীয় রীতির অংশ হিসেবে ধান-দুর্বা, সিঁদুর, তেল, ফল-ফলাদি সমুদ্রের জলে সমর্পিত করছিলেন এবং নারীরা উলু ধ্বনি দিচ্ছেলেন। সূর্যোদয়ের অরুন আভায় চারদিকে কেমন জানি একটা পবিত্রতা ভাস্কর হয়ে স্বর্গীয় ভাব বিরাজ করছিল। সমুদ্রের পাড়ে কয়েকজন শিশু-কিশোর কে মাথার সব চুল নাপিতের মাধ্যমে ফেলে দিয়ে নেঁড়ে হতে দেখলাম, কিছু বয়স্ক মানুষও একই কাজ করছেন এবং ব্রাহ্মনের মাধ্যমে নতুন গামছা কিংবা কাপড় পরিধান করে সামনে কলাপাতায় পূজা সামগ্রী নিয়ে মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে কিছু একটা করছেন। বাবা জানালেন ধর্মীয় মানত ও অন্যান্য ধর্মীয় কারণে পবিত্রস্থান হিসেবে সমুদ্রের সামনে যুগ যুগ ধরে এসব চলে আসছে। স্নান এর পরে আমরা সহ সকলেই কাঁচের বোতল কিংবা অন্য কোন পাত্রে সমুদ্রের জল সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিলাম, কেননা সেই মুহুর্তের জল সবচেয়ে পবিত্র বস্তু হিসেবে পরবর্তীতে ব্যবহূত হত। পরিবার বা আত্মীয় স্বজনেরা যারা কিনা সমুদ্রে আসতে পারেননি তারা এ জল মাথায় ছিটিয়ে এবং পান করে নিজেদেরকে পবিত্র করতেন।
জীবনের প্রথম সমুদ্র দর্শন শিশু বয়স আর ধর্মীয় উদেশ্যের কারনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অবগাহনের আলদা ভাললাগা ধারন করার মত মনের গভীরতা তখন না থাকলেও সমুদ্রের বুক চিরে লাল আভায় বিকশিত হয়ে আধো অন্ধকার নির্মল ভোরের আকাশে উদীয়মান প্রথম সুর্যোদয় অবলোকনে মনের গভীরে ধর্মীয় বিশ্বাসের গন্ডি অতিক্রম করে তা হয়ত অপার সৌন্দর্য্যের প্রতিকৃত্তি হিসেবেও পোথ্রিত হয়ে গিয়েছিল।
এর পরে শৈশবে-কৈশোরে-যৌবনে বহুবার কুয়াকাটা, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন সমুদ্র্রে স্নান করেছি, সৈকতের সৌন্দর্যও বহুভাবে উপভোগ করেছি কখনও একাকী কখনও পরিবার-আত্মীয় স্বজনের সাথে কখনও সহপাঠী-সহকর্মী বন্ধুদের সাথে কখনও প্রিয়তমা সহধর্মীণীকে নিয়ে মধুচন্দ্রিমায়। সমুদ্র দর্শন, সমুদ্রে স্নান কিংবা সৈকতের প্রকৃতি প্রতিবারেই আমার মনের সৌন্দর্য পিপাসাকে আরও বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে, অনেক অনেক ভাললাগায় হৃদয় পরিপূর্ণ হয়েছে। তবে আশির দশকে শৈশবে প্রথম কুয়াকাটা সমুদ্রের পূণ্য স্নান ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রবল আধিক্যে অন্তরে যে স্বর্গীয় সুখ জাগরিত করেছিল সে স্মৃতি ভোলার নয়।
লেখক : সাংবাদিক

News Editor : Ganash Chanro Howlader. Office: 38-42/2 Distillery Road, 1st floor, Gandaria, Dhaka-1204.