এই হত্যাকাণ্ডের ফলে ইরান ও ইরানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাহিনী হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুতিদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল, স্থায়ীভাবে ঝুঁকির মুখে পড়লো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-সৌদি সম্পর্ক। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান কী পদক্ষেপ নেয় সেদিকে
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানি এবং ইরাকের হাশদ আশ-শাবি বাহিনীর উপ-প্রধান আবু মাহদি আল-মুহানদিস মার্কিন হেলিকপ্টার হামলায় নিহত হয়েছেন।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) ভোররাতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদেরকে বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে হেলিকপ্টার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশেই জেনারেল কাসেম সোলায়মানিকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চরম উত্তেজনার মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প সোলায়মানিকে হত্যার মতো ঝুঁকি কেন নিতে গেলেন?
কেন হত্যা করা হলো
১৯৮০-১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধে জেনারেল সোলাইমানি “সারুল্লাহ” নামে একটি ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন। ওই যুদ্ধে “সারুল্লাহ” ডিভিশনের বীরোচিত যুদ্ধ কৌশল ও সাফল্যের মাধ্যমে সোলাইমানি ইরানের নেতৃবৃন্দের নজরে আসেন। ১৯৯৭ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি তাকে বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপরই কাসেম সোলায়মানি ইরানের প্রতিরক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারক হিসেবে আবিভূত হন। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের বিভিন্ন খবরে বলা হয়, দায়িত্ব পাওয়ার পর সোলায়মানি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের স্বার্থ দেখভাল ও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিরোধী তৎপরতা শুরু করেন। মাত্র এক দশকের মধ্যেই সোলায়মানির বাহিনী ইরাকের আশ-শাবি, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনে হুথিসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ছাড়াও আফগানিস্তান, পাকিস্তান এমনকি ইসরায়েলের ভেতরেও প্রশিক্ষণ, অর্থ-অস্ত্র সহায়তা দিতে তাদের সমর্থক তৈরি করেন। যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তন করে দেয় এবং ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। বাহিনীটি মধ্যপ্রাচ্যের ১৫-২০ দেশে ছোট ছোট গোপন মিশন পরিচালনা করে বলেও ধারণা করা হয়। গত কয়েক বছরে ইরাকে আইএস’র পরাজয়, সিরিয়ায় বাশার আল আসাদকে টিকিয়ে রাখা ও আইএস দমন, এবং ইয়েমেনে সৌদি জোটের বিরুদ্ধে হুথিদের শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়টিকে আরআরজিসি’র সাফল্য বলেই মনে করা হয়।
আরও পড়ুন – ট্রাম্পের নির্দেশেই জেনারেল সোলায়মানিকে হত্যা
অতিসাম্প্রতিককালে যুক্তরাজ্যের পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সৃষ্ট উত্তেজনায় মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত ও হরমুজ প্রণালী থেকে ব্রিটিশ তেল ট্যাংকার আটক করার কাজটিও সম্পন্ন করে আইআরজিসি। এসব ঘটনা আইআরজিসির চৌকস সামরিক সক্ষমতারই প্রমাণ দেয় যা বাহিনীটি ইরান বিরোধীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ইরানকে দমন করতে আইআরজিসি’কে
গতবছরই যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আইআরজিসিকে “সন্ত্রাসী বাহিনী”র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা তারই নির্দেশ করে।
কী হবে ইরানের প্রতিক্রিয়া
প্রকৃতপক্ষে ইরানের রাজনীতিতে আয়াতুল্লাহ খোমেনির পর দ্বিতীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে আর্বিভূত হন জেনারেল সোলায়মানি। তাই ইরানের প্রতিরক্ষার মেরুদণ্ড হিসেবে ধরা হয় সোলায়মানির নেতৃত্বাধীন আইআরজিসি’কে। দেশটির ইতিহাসে তিনি ছিলেন সবচেয়ে মেধাবী সমরবিদ। বছরের পর বছর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধে কাবু ইরান যে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলো তার অন্যতম নায়ক ছিলেন সোলায়মানি। কৃতিত্বের স্বীকৃতিসরূপ খোমেনি তাকে “অর্ডার অব জুলফিকার” পদকে ভূষিত করেন। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর সোলায়মানিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এই সম্মান পেয়েছেন।
নিউইয়র্কভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেঞ্চুরি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা দিনা এসফ্যানদিয়ারের মতে, সোলাইমানি ইরানের প্রেসিডেন্টের চেয়েও ক্ষমতাধর ছিলেন। তিনি সরাসরি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীনে ছিলেন। দেশে, বিদেশে, সরকার ও সরকারের বাইরে তার ফোর্সের লোক ছিলো।
আরও পড়ুন – খোমেনি: ‘কঠোর প্রতিশোধ’ অপেক্ষা করছে
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের “ফরেন পলেসি” জার্নাল বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পেশায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে। ওই তালিকায় সামরিক খাতে সোলায়মানিকে এক নম্বরে রাখা হয়। ইসরায়েল ও সৌদি দীর্ঘদিন ধরেই সোলায়মানিকে হত্যার জন্য তদবির চালিয়ে যাচ্ছিলো বলে অভিযোগ ছিল। সোলায়মানিকে হত্যা ইসরায়েল ও সৌদি যেমন খুশির, তেমনই চলতিবছরের নভেম্বরে আসছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রাম্পকার্ড হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই হত্যাকাণ্ডের ফলে ইরান ও ইরানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাহিনী হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল সে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এছাড়া স্থায়ীভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-সৌদি সম্পর্ক। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান কী পদক্ষেপ নেয় সেদিকে।
সোলায়মানি হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সবোর্চ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেসব অপরাধীদের নোংরা হাত জেনারেল সোলায়মানির রক্ত ঝরিয়েছে তাদের জন্য কঠোর প্রতিশোধ অপেক্ষা করছে।
এছাড়া এই হত্যাকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চরম মূল্য পরিশোধ করতে হবে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে আইআরজিসি।
আরও পড়ুন – সোলায়মানি: সাধারণ কিশোর থেকে প্রেসিডেন্টের চেয়েও ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা
রাজনীতি বিষয়ক মার্কিন বার্তা সংস্থা “পলিটিকো” এবিষয়ে এক সংবাদ বিশ্লেষণে লিখেছে, সোলায়মানিকে হত্যার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক নম্বর শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করা হলো। তবে এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন স্বার্থের জন্য বুমেরাং হতে পারে এবং ওই এলাকা হয়ে উঠতে পারে রণক্ষেত্র।
আইআরজিসি সম্পর্কে লেখা “ভ্যানগার্ড অব দ্য ইমাম” বইয়ের লেখক আফসোন অসতোভারও এক টুইট বার্তায় বলেছেন, ইরান অবশ্যই এর প্রতিশোধ নেবে। কোনো মতেই তারা ছাড় দেবে না।
সোলায়মানিকে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ইরান চাইবে এটি বাড়ুক। যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বিশ্ব অর্থনীতিতে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইরান কি সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে? এখনই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন। তবে অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার যাঁতাকলে পিষ্ট ইরান ইরাক-ইরান যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে আরেকটি যুদ্ধে জড়াবে, আমার তা মনে হয় না।
আবু আজাদ, সংবাদকর্মী
*****************************************************************************************************************
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনও ধরনের দায় নেবে না।