অনলাইন ডেস্ক : সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরে যাওয়ার বয়সসীমা ৫৯ বছর থেকে ৬০ বছর করে ২০১৩ সালে করা আইন অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬১ বছর করা উচিত বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। এ সংক্রান্তে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে গতকাল এ রায় দেন বিচারপতির গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি একেএম সাহিদুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার বয়সসীমা ৬১ করা উচিত ছিল। কিন্তু সেটা না করা বৈষম্যমূলক হয়েছে। এ কারণে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের ৬১ বছর পর্যন্ত সকল সুবিধা দেবে বলে আদালত মনে করেন।
আদালতে রিটকারীদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী এবিএম সিদ্দিকুর রহমান খান, গাজী মোশতাক আহমেদ ও ইশতিয়াক আহমেদ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এএসএম নাজমুল হক। রায় শেষে এবিএম সিদ্দিকুর রহমান খান সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্ট রায়ে মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছরকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছেন। আদালত বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬১ বছর করা উচিত। তাদের অবসরের বয়সসীমা কমিয়ে দেয়া সংবিধানের ২৭, ২৯ ও ৩১ অনুচ্ছেদ এবং সরকারি নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি ২০১৩ সালের অবসর সংক্রান্ত আইনের ওই সংশোধনী (মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা) অবৈধ ঘোষণা করেছেন আদালত। আইনজীবী এবিএম সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন, ভবিষ্যতে যদি গণকর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয় তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে তা দু’বছর বাড়াতে হবে। রিটকারীদের অন্য আইনজীবী গাজী মোশতাক আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, যে আইনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর করা হয়েছিল সেই আইনটিকে আমরা চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। আদালত মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের ৬০ বছরের বয়সসীমাকে বাতিল বলে রায় দিয়েছেন। পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়সসীমা ৬১ বছর করা উচিত বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। গাজী মোশতাক আহমেদ বলেন, হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে চাকরিজীবী মুক্তিযোদ্ধারা ৬১ বছর বয়স পর্যন্ত অবসরের সকল সুযোগ-সুবিধা পাবেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এএসএম নামজুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এ রায়ের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমা ৫৯ হলো। তবে ৬১ বছর পর্যন্ত সুবিধা পাবেন কি-না সেটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়।
গতকাল রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি মুক্তিযোদ্ধা সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে অবসরের বয়সসীমা সাধারণ চাকরিজীবীদের চেয়ে ২ বছর বাড়িয়ে ৬১ বছর করার সিদ্ধান্ত দিয়ে তা বাস্তবায়ন করার জন্য মন্ত্রণালয়কে বলেছিল। কিন্তু সরকার সেটি না করে এক বছর বাড়িয়ে ৬০ বছর করে। এতে জাতীয় সংসদের অভিপ্রায় আইনের মধ্যে প্রতিফলিত হয়নি। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, সরকারি চাকরিতে সকলের অবসরের বয়সসীমা ছিল ৫৭ বছর। সেখানে চাকরির বয়সসীমা ২ বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছর করে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে সকলের চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমা ৫৯ বছর করে সরকার। এ অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করতে তাদের এক বছর বাড়ানো হয়।
কিন্তু প্রথমে দুই বছর দিয়ে সম্মানিত করার পর এক বছর করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান খাটো করা হয়েছে। এটি সরকারেরই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অযৌক্তিক।
সরকার ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘পাবলিক সার্ভিস রিটায়ারমেন্ট অ্যাক্ট’ সংশোধন করে মুক্তিযোদ্ধা সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে অবসরের বয়সসীমা এক বছর বাড়িয়ে ৬০ বছর করে। এ অবস্থায় চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমা ২ বছর বাড়ানোর নির্দেশনা চেয়ে দুই মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মচারী সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম মশিউর রহমান ওয়ারেশী ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার তপন কুমার সাহা গত বছর হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিটের শুনানি শেষে রুল জারি করেন আদালত। এরপর রিট আবেদনকারীরা ২০১৩ সালের আইনের সংশোধনী বাতিল চেয়ে সম্পূরক আবেদন করেন। এ আবেদনেও রুল জারি করেন আদালত। উভয় রুলের ওপর শুনানি শেষে গতকাল রায় দিলেন হাইকোর্ট।