রাজধানীবাসীকে সেবাদানকারী ২৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয়হীনতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কাজের সুবিধার্থে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসার দাবিও অনেক পুরনো। এদিকে, নাগরিক সেবা বাড়াতে সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকেও একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। তারপরও কাজ হচ্ছে না। নেতৃত্বপ্রাপ্ত দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ছাড়া কোনও সংস্থাই বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না। এ অবস্থায় ডিএসসিসি’র মেয়র সাঈদ খোকন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব বরাবর একটি অভিযোগপত্র দিয়েছেন।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, রেল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, গণপূর্ত, সড়ক ও যোগাযোগ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় রাজধানীর উন্নয়নে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে। এছাড়া, অর্থ এবং পরিকল্পনাসহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয় পরোক্ষভাবে ঢাকার উন্নয়নের অংশীদার। এসব মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২৬টি সেবাদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো হলো— ঢাকা ওয়াসা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি, ডেসকো, বিটিসিএল, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বাংলাদেশ রেলওয়ে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর, স্বাস্থ্য অধিদফতর, সমাজসেবা অধিদফতর, পরিবেশ অধিদফতর, এনজিও ব্যুরো, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), তথ্য অধিদফতর, বিআরটিসি, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ।

এছাড়া, ঢাকার উন্নয়নে কাজ করছে বিশ্বব্যাংক, জাপানি সাহায্য সংস্থা (জাইকা)-সহ সেবাদানকারী বেশকিছু দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।সব মিলিয়ে রাজধানীতে মোট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৬টি।

নাগরিক ও নগর বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ— নাগরিক সেবা বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এক সিটি করপোরেশনকে ভেঙে দু’টি করার পাশাপাশি এর আয়তনও বাড়ানো হয়েছে। এরপরেও কাজে গতি আসছে না। সেবার মান বাড়ছে না। সেবা প্রদানকারী সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সেবাদানে সরাসরি জড়িত এমন ২৬টি সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে নগরবাসী তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছে না। এ অবস্থায় সেবা সংস্থাগুলোকে একই ছাতার নিচে আনতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিপত্র জারি করা হয়।

সূত্র জানায়, গত বছরের ২৭ জুন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর স্বাক্ষরিত ওই পরিপত্র জারি করা হয়। এতে বলা হয়— সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত সেবা প্রদানকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি দফতরের প্রধানরা সিটি করপোরেশনের আমন্ত্রণে সভায় যোগদান করে সভার গৃহীত সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি সিটি করপোরেশনকে অবহিত করবেন। কিন্তু এসব কিছুই মানছে না সেবাসংস্থাগুলো। এ অবস্থায় সংস্থাগুলোর সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বিষয়টি অবহিত করে গত ৫ মে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বরাবরে চিঠি দিয়েছেন।

ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি
ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি
মেয়র চিঠিতে অভিযোগ করেন, ‘অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আয়োজিত সেবা প্রদানকারী সরকারি দফতরগুলোর সমন্বয় সভায় বেশির ভাগ দপ্তফতরের প্রধানরা উপস্থিত থাকছেন না। তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সভায় এমন সব কর্মকর্তাকে পাঠাচ্ছেন, যাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা মতামত দেওয়ার এখতিয়ার নেই। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমন কর্মকর্তারা আলোচনায় অংশ নিতেও পারেন না। এ পর্যন্ত দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আহ্বানে যতগুলো সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার প্রতিটিতেই অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। সরকারের আদেশ অমান্য করে দফতর প্রধানরা সভায় অনুপস্থিত থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় সমন্বয় সভায় সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন দফতর প্রধানদের অনুপস্থিতির বিষয়টি অবহিত করে এ বিসয়ে পরবর্তী নির্দেশনা প্রদানের জন্য আপনার ব্যক্তিগত সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিপত্রে রাজধানীতে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করতে বলা হলেও কেউ তা আমলে নিচ্ছে না। এ কারণে দুই সিটি করপোরেশন কোনও সিদ্ধান্ত নিলে তা যেমন বাস্তবায়ন হয় না, তেমনই নগরের উন্নয়ন কাজেও গতি পাচ্ছে না।

দুই সিটি করপোরেশনের সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই পরিপত্র জারি হওয়ার পর মেয়র আনিসুল হক একটি সভা করেছিলেন। অন্যদিকে, সাঈদ খোকনও এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সমন্বয় সভা করেছেন। কিন্তু এসব সভায় অন্যান্য সংস্থার উল্লেখযোগ্য কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সচিব মো. শাহাবুদ্দিন খান (যুগ্মসচিব) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ পর্যন্ত তিনটি সভা, পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি বিষয়ভিত্তিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমন্বয় সভাগুলো ইতিবাচক। আমরা যেভাবে কো-অর্ডিনেশন করছি, তাতে আরও উন্নতি হবে। মেয়র সাহেব নিজেই সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করছেন।’
ডিএনসিসির অধীনস্ত সেবা সংস্থাগুলোকে নিয়ে এখন আর সমন্বয় সভা হয় কিনা জানতে চাইলে সংস্থার প্যানেল মেয়র ওসমান গনি জানান, সমন্বয় সভা না হলেও তারা সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা দীর্ঘদিনের। আমাদের দেশের প্রতিটি সেবা সংস্থা নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে কাজ করতে চায়। অন্যদের অধীনে তারা কাজ করতে চায় না। সবাই নিজেকে শাসক ভাবে। তারা জানে যে, সমন্বিতভাবে কাজ হলে বরাদ্দের টাকা নয়-ছয় করার সুযোগ কমে যায়। এজন্যই তারা চায় না সব সেবাসংস্থার মধ্যে সমন্বয় হোক।’

তিন আরও বলেন, ‘একটি সিটির যতগুলো সেবা সংস্থা থাকে, সেগুলো নগর সরকারের অধীনেই থাকে। উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে নগরের উন্নয়নে সব ধরনের বাজেট নগর সরকারের অধীনে হয়ে থাকে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো নগর সরকারে আগ্রহী না। কারণ, এটা কার্যকর হয়ে গেলে তাদের কর্তৃত্ব কমে যাবে বলে মনে করা হয়।’

তিনি বলেন,‘এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী যে পরিপত্র জারি করেছেন, তারা সেটাকে প্রাধান্য দিচ্ছে না। ঢাকা শহরে নগর সরকারের অধীনে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।’