হয়তো আমার মতো কোনো বাবা সংসার চালাতে দিনান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন, কেউবা ছোটখাটো ব্যবসা চালিয়ে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগান অথবা কোনো বেকার যুবক জুতার শুকতলা ক্ষয়ে-ক্ষয়ে একজন বেলা বোসকে বিয়ে করার জন্য হন্যে হয়ে অফিসে অফিসে জীবনবৃত্তান্ত বিলি করছেন, কেউবা ভার্সিটির রেজাল্টে ভালো করে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হতে চাচ্ছেন! সেই ঘামের গন্ধ যতই তীব্র হোক, কল্পনা করি এই ঘামে মিশে আছে কত শত প্রেম-ভালোবাসা-আবেগ-শ্রম।
আজ অবশ্য বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হলো না। বাসের লাল মাথাটা উঁকি দিচ্ছে। উঠে পড়লাম। বাসে ভিড় আছে, তবে খুব বেশি নয়। আমাকে দাঁড়াতে হলো বাসের মাঝামাঝি একটা জায়গায়। পাবলিক বাসে যতই পেছনের দিকে দাঁড়াই না কেন, কন্ডাক্টর বারবার আরও পেছানোর জন্য তাগাদা দিতে থাকবেই। এখন এসব গা সওয়া হয়ে গেছে, আর পাত্তা দিই না। প্রতিদিন এই এক রাস্তা দিয়ে চলাচল আমার। রাস্তার বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, আশপাশের দোকানের নাম দেখতে দেখতে মুখস্থ হয়ে গেছে। এখন আর রাস্তা দেখি না। কিন্তু যাওয়া-আসার অনেকটা সময় পার করতে হয় বাসে, তাই সময় কাটাতে মানুষ দেখি। কখনো-বা বাসের বাইরে, কখনো-বা ভেতরে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষগুলোকে দেখছি আর তাদের ভেতরটা পড়ার চেষ্টা করছি। অদ্ভুত খেলা এটা আমার। সিটে বসে থাকা বেশির ভাগ মানুষ মোবাইলে খোশগল্প, ইউটিউব ব্রাউজিং, চ্যাট, গেমিং, ফেসবুকিং অথবা গান শোনায় ব্যস্ত। মোবাইল ফোন কাছে থাকলে সময় আসলে উড়ে উড়ে চলে। আমার কাছেও একটা ফোন আছে সত্যি, কিন্তু সব সময় এটা নিয়ে সময় কাটানো আমার পছন্দ নয়। বাসের মধ্যে তো একেবারেই নয়।
মহাখালী আসার পর বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। এদিক-ওদিক চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে নজর পড়ল মহিলা সিটে বসা এক তরুণীর ওপর। রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। এ প্রথম বাসে কোনো মেয়েকে বই পড়তে দেখলাম। চোখের সামনে মেলে আছে বইটা। বইয়ের নাম জানতে ইচ্ছা করছে খুব, কিন্তু উল্টো দিক থেকে দেখার কোনো উপায় নেই। একসময় আমারও বই পড়ার খুব নেশা ছিল। ঘরভর্তি এখনো ঠাসা বই। যদিও পড়ার সুযোগ আর হয়ে ওঠে না। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত অফিসফেরত শরীর চায় বিশ্রাম। এখন বই হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। তবু ভালো লাগত আমার স্ত্রী ইলা যদি দু-একটা বই পড়ত! কিন্তু ও কোনো দিন বই নিয়ে বসেছে বলে আমার মনে পড়ে না।
বাস বনানী এসে পৌঁছেছে। আবার ভিড়ে ঠাসাঠাসি। এবার বিরক্ত লাগছে। পড়ুয়া মেয়েটা ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। বইয়ের নামটা দেখার আগেই মেয়েটা নেমে যাবে না তো! আবার আমার নিত্যদিনের অন্য এক খেলায় ফিরে এলাম। সময় কাটানোর এটাও এক মজার খেলা। প্রতিদিন বাসে উঠে আমি ভাবতে বসি ইলা টিফিন ক্যারিয়ারে ভাতের সঙ্গে আর কী কী দিয়েছে। তারপর দুপুরে খাবার টেবিলে বসে মেলাই। কালে-ভদ্রে মিলে যায়; বেশির ভাগ সময় মেলে না। তবে এ খেলা খেলতে আমার বেশ লাগে। মাঝে মাঝে পোলাও, বিরিয়ানি অথবা ভুনাখিচুড়ি দিয়ে ইলা আমাকে চমকে দেয়। নিস্তরঙ্গ জীবনে ইলারও হয়তো এটা একটা খেলা। আমি বাসায় ফিরে ওর খাবারের স্বাদের প্রশংসা করব, মনে মনে ইলা হয়তো তা-ই চায়। আজ কী দিয়েছে ইলা? কী হতে পারে আজকের আইটেম? আলু-বেগুন দিয়ে কাঁচকি মাছের চচ্চড়ি, বেগুনভাজা আর পাতলা ডাল। মন বলছে এসবই… অতএব দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাক।
শ্যাওড়া এসে গেছে, আর কিছুক্ষণ পর নামতে হবে। মেয়েটা কোথায় নামবে কে জানে। যদি আগে নেমে না যায়, ভিড় ঠেলে আমি যখন নামব তখন বইয়ের নামটা দেখতেই হবে। কী বই পড়ছে সে? গল্প-উপন্যাস-কবিতা নাকি নিতান্তই একাডেমিক কোনো বই? কোন মানের পাঠক মেয়েটি? এটা অবশ্য সে কার বই পড়ছে, তা দেখলেই অনেকটা বুঝতে পারব। তবে এ ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম যুগে পাবলিক বাসে কোনো তরুণী ফোন না দেখে বই পড়ছে, এ বড় আশ্চর্যের বিষয় বৈকি। ধীরে ধীরে সিট ছেড়ে ভিড় ঠেলে সামনে এগোতে থাকলাম। এয়ারপোর্ট এসে গেছে, অনেক যাত্রী নামবে।
এখনো মহিলা সিটের কাছাকাছি যেতে পারলাম না। মনটা খারাপ লাগছে। তবে কি বইটা দেখতে পাব না। গলা উঁচিয়ে মেয়েটার দিকে তাকালাম। সে বইটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলছে; তাহলে সে-ও এখানেই নামবে। নামার পর্ব চলে এলো আমার, নেমে পড়লাম। এক মিনিট দাঁড়াতে ইচ্ছা করল। মেয়েটি যদি নামে তবে একটু অপেক্ষা করে দেখেই যাই।
ঠিক পনেরো-বিশ সেকেন্ডের মধ্যে কন্ডাক্টর মেয়েটির হাত ধরে তাকে নামিয়ে দিল। আমি বিস্মিত। এমন যুবতী মেয়ের গায়ে হাত দিয়ে কন্ডাক্টর নামাল আর মেয়েটা কিছুই বলল না! যেখানে ভিড়ে ঠাসাঠাসি বাসেও মেয়েদের শরীরে যাতে স্পর্শ না লাগে, তেমন নিরাপদ দূরত্বে পুরুষদের দাঁড়াতে হয়। প্রায়ই দেখি শরীর ছোঁয়াছুঁয়ি নিয়ে বাসে ঝগড়া লেগে যায়। আর নিজ থেকে মেয়েটি তাকে ধরতে দিল? কথাগুলো মগজে খেলে যেতে-যেতেই দেখি মেয়েটা তার ব্যাগের চেইন খুলে একটা সাদা ছড়ি এবং একটি রোদচশমা বের করল। আমি আর আমার আবেগ চেপে রাখতে পারলাম না, মেয়েটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
-প্লিজ…কিছু মনে করবেন না। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
-জি, বলুন।
-আমরা মানে আপনি আর আমি একই বাসে এলাম। বাসে আপনার সামনে একটা বই দেখে ভেবেছিলাম আপনি পড়ছিলেন।
-শুনে হয়তো আপনার অবাক লাগতে পারে, আমি আসলেই পড়ছিলাম, তবে তা নিজের মনের ভেতর। চার বছর আগে গ্লুকোমায় আমার দুটো চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। একসময় অনেক বই পড়তাম; মানে তথাকথিত ‘আউটবই’। এখনো খুব পড়তে ইচ্ছা হয়, কিন্তু পারি না চোখের কারণে। তাই পড়া বইগুলোর পাতা ওল্টাই আর বইয়ের লাইনগুলো ভাবতে থাকি।
-ওহ্! স্যরি…আসলে আমার খুব জানার ইচ্ছা ছিল আপনি কী বই পড়ছিলেন, কিন্তু আমি ভাবতে পারিনি…
-যখন বাসে উঠি, সব সময় চোখের সামনে একটা বই মেলে রাখি। আসলে বাসের ভেতরে-বাইরে যেদিকেই তাকাই না কেন, সব তো আমার কাছে একরকম-ভেতর যা, বাহিরও তাঘন অন্ধকার! কিন্তু বই মেলে রাখলে মনে হয় আমি ঘটনাগুলো সব চোখের সামনে দেখছি। বিশ্বাস করুন, আমার চারদিকে তখন আলো আর আলোর মেলা যেন! আজ গাড়িতে সমরেশের ‘কালবেলা’ নিয়ে বসেছিলাম। কত বছর আগে পড়েছি। অথচ এখনো চোখের সামনে মাধবীলতা-অনিমেষকে ঠিকই দেখতে পাচ্ছিলাম।
আমাদের কথোপকথনের এ পর্যায়ে ত্রিশ-বত্রিশ বয়সী এক যুবক এসে মেয়েটির হাত ধরে বলল ‘চলো’…
হয়তো আগেই এখানে দুজনের মিলিত হওয়ার কথা ছিল। মেয়েটি ‘আসি’ বলে যুবকের হাত ধরে চলে গেল। আমারও অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছিল; দ্রæত এয়ারপোর্টের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কয়েক পা যেতেই মনে হলো, মেয়েটার নামটা জানা হলো না। কিন্তু নাম না জানা মেয়েটি আজ আমার চোখের সামনে একটা জানালা খুলে দিয়ে গেল।
এয়ারপোর্ট রোড ধরে আমার সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে যেতে শুরু করল মগজের কোষে ফিকে হয়ে যাওয়া ‘কালবেলা’। মাধবীলতা ও অনিমেষের হাত ধরে আমি অফিসের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলাম।
রায়রেবাজার, ঢাকা।
ডেইলি বাংলাদেশ/আরএস