মোস্তফা কামাল, যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি:

বাল্যকালে লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, নবম শ্রেণিতে পড়াকালে ছাত্রলীগের পক্ষে হরতালের মিছিলের নেতৃত্ব দেন, তখন থেকে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হৃদয়ে ধারণ করেন, তিনি সৎ এবং ভালো মানুষ, জনকল্যাণে কাজ করেন, দেশ ও দেশের মানুষকে তিনি জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন, আর এই ভালোবাসা থেকে হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় নেতা।

বলছিলাম সিলেটের নতুন নগরপিতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর কথা।

সম্প্রতি যিনি লক্ষাধিক ভোট পেয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের কান্ডারি হয়ে  সিলেটের নতুন নগরপিতা নির্বাচিত হয়েছেন।

যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আনোয়ারুজ্জামান এবারই প্রথম সিলেটের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।

নৌকা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজার ৯৯১ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল পেয়েছেন ৫০ হাজার ৩২১ ভোট।

যেভাবে হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় নেতা:

তৃণমূল থেকে গড়ে ওঠা একজন রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯৭৮ সালের দিকে পশ্চিম তিলাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি মৌসুমী সমাজ কল্যাণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

৮ম শ্রেণিতে থাকতেই তার রাজনৈতিক চেতনাবোধ জাগ্রত হতে থাকে। সেসময় এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে এবং ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রধর্মঘট, ক্লাস বর্জন ও হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। তখন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী তার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। তখন বুরুঙ্গায় ছাত্রলীগের কোনো কার্যক্রম ছিল না।

নিজ চেতনাবোধ থেকে তিনি এসব কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। নবম শ্রেণিতে পড়াকালে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সারা দেশে হরতাল ডাকা হয়। হরতালের দিন আনোয়ারুজ্জামান  মিছিলের নেতৃত্ব দেন।

বুরুঙ্গা সড়কের মুখে কিছু বখাটে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মিছিলে আগত নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনার খবর পেয়ে তাজপুর থানা আওয়ামী লীগের নেতারা ছুটে আসেন এবং এর সমাধান করেন। এ ঘটনায় আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী নেতাদের নজরে চলে আসেন।

তখন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এমএ গনি, সাধারণ সম্পাদক ছালেহ আহমদ ও থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন ইকবাল আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দাল মিয়া। পরবর্তী সময়ে বালাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে মো. আব্দাল মিয়াকে সভাপতি ও আব্দুল মতিনকে সাধারণ সম্পাদক করে উপজেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সমাজসেবা সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত আনোয়ারুজ্জামান সিলেট সরকারি কলেজে লেখাপড়া করেন। সে সময় তিনি ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ থেকে ছাত্র মিলনায়তন সম্পাদক পদে নির্বাচন করেন। এছাড়া তিনি ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সিলেটের রাজপথে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন।

১৯৯০ সালের শেষের দিকে তিনি সিলেট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানে গিয়েও তিনি থেমে থাকেননি। প্রথমে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রবাসীদের সুখ-দুঃখের সাক্ষী হিসেবে তাদের পাশে থাকেন সব সময়।

আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সিলেট-২ আসনে এমপি প্রার্থী হতে কয়েকবার তৎপরতা চালালেও দলীয় মনোনয়ন জোটেনি। তারপরও বসে থাকেননি তিনি। জাতীয় সংসদ থেকে স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনকালে ছুটে এসেছেন দেশে। দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে সরব থাকতে দেখা গেছে তাকে। বিশেষ করে সিলেট-১ ও সিলেট-৩ আসন, সিলেট জেলা পরিষদ ও ওসমানীনগর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিজয়ে বিশেষ ভুমিকা পালন করেছেন। নৌকার বিজয় নিশ্চিতে দিনরাত খেটেছেন।

এ কারণে শুধু বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগরেই নয়, সিলেট সদর ও সিলেট সিটি করপোরেশন এবং ফেঞ্চুগঞ্জে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে আলাদা গুরুত্ব রয়েছে তার। নেতাকর্মীরাও যেন তার মাঝে প্রয়াত মেয়র কামরানের স্বভাবসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পান। এভাবেই আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন কর্মী হয়ে তিলে তিলে গড়ে ওঠা একজন মানবিক কর্মী এবং ক্লিন ইমেজের রাজনীতিবিদ।

যেভাবে নৌকার কান্ডারি থেকে মেয়র

কমিশনার থেকে পৌর চেয়ারম্যান এবং পরে সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) উন্নীত হওয়ার পর প্রথম মেয়র ছিলেন প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। এরপর দুই মেয়াদে নির্বাচিত মেয়র ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে হয়ে ওঠেন ‘জনতার কামরান’। গত দুই মেয়াদে আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হারার পরও মানুষের ভরসাস্থল ছিলেন কামরান। অতিমারিতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে জীবনপ্রদীপ নিভে যায় সাবেক এই মেয়রের। সিসিক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর কামরানবিহীন নগরে নৌকার কান্ডারি নিয়ে সংকটে ভুগছিল ক্ষমতাসীন দলটি। যদিও নৌকার মাঝি হতে দলীয় মনোনয়ন কিনেছিলেন ১১ জন। তবে শেষ পর্যন্ত ১০ জনকে পেছনে ফেলে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পান তিনি।

যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক

যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সব সময় দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে দিনরাত যুক্তরাজ্যেও কাজ করেছেন। ভবিষ্যতেও দলের স্বার্থে কর্মীদের তিনি পরিবারের সদস্যদের মতো আগলে রাখতে চান।

তিনি যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা নিউহাম বেঙ্গলি কমিউনিটি ট্রাস্টের (এনবিসিটি) কো-অর্ডিনেটর ছিলেন।

পারিবারিক জীবন

সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলার বুরুঙ্গাবাজার ইউনিয়নের পশ্চিম তিলাপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৭০ সালের ১ জুন জন্মগ্রহণ করেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। তার বাবা নৌশা মিয়া চৌধুরী এবং মা গহিনুন্নেছা চৌধুরী। ছয় ভাইয়ের মধ্যে আনোয়ারুজ্জামান সবার ছোট। সবাই যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।