বিচিত্র জীবনের সচিত্র প্রতিবেদন পর্ব – ১৪

মোঃ মঞ্জুর আহমেদ, ইউকে (লন্ডন) স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট :

বাংলাদেশের এক বীর মুক্তিযোদ্ধার (বিডিআর) পুত্র মোঃ মনজুর আহমেদ যে নাকি মাতৃগর্ভে থাকতেই তার জন্মদাতা পিতা দেশকে স্বাধীন করতে ১৯৭১ সালে রনাঙ্গনে বীরের মতো প্রান দেন। পিতৃহারা শৈশব-কৈশোরে প্রতিনিয়ত যুদ্ধে জয়ী হয়ে দক্ষিনের সাগরবিধৌত কলাপাড়া উপজেলার সেই ছেলেটি নিজ এলাকায় প্রাথমিকের শিক্ষা, খেপুপাড়া সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ঢাকায় বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ (BNMPC) (সাবেক রাইফেলস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ) থেকে সম্পূর্ণ নিজ চেষ্টায় এইচএসসি’গন্ডি সফলভাবে শেষ করেন, ১৯৯৩ ঢাকা কলেজ থেকে বিএ (পাশ) করে ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ বেসামরিক সহকারী পদে বাংলাদে রাইফেলস চাকুরির পাশাপাশি এল এল বি ১৯৯৮, এবং এম এস এস (সমাজ বিজ্ঞান) বিষয়ে স্নাতকোত্তর যোগ্যতা অর্জণ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর চাকুরি থেকে অকালিন অবসর গ্রহণ করে যুক্তরাজ্য, লন্ডন লেখাপডার জন্য প্রবাস জীবন শুরু করেন এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস্ থেকে ২০১০ সালে এম বি ডিগ্রি সফলতার সাথে অর্জণ করেন। বর্তমানে এন এইচ এস এস ট্রাস্ট, কুইন্স হসপিটাল, লন্ডন কর্মরত পাশাপাশি আইন পেশা ব্যাবসার সাথে জড়িত পারিবারিক জীবনে ২০০৮ সাল থেকে স্ত্রী ছেলে তার সাথে লন্ডন বসবাস শুরু করেন বড় ছেলে আহমেদ আল আমিন প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে স্নাতক ডিগ্রী গ্রীনউইচ ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১৯ সালে ফিজিক্যাল এ্যাডুকেশন এন্ড স্পোর্টস সম্মান সম্পন্ন করে। ছোট ছেলে একই ভাবে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বর্তমানে ওয়েসমিনিস্টার ইউনিভার্সিটিতে সাইকোলজি এন্ড কাঊন্সিলিং বিষয়ে অনার্স অধ্যায়নরত। স্ত্রী মিসেস রেবেকা সুলতানা পাপড়ি ক্যামডেন কাউন্সিল, লন্ডন কর্মরত। তিনি স্বপরিবারে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুবিধাসহ ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জণ করেছেন। তার জীবনের খুব কাছ থেকে দেখা জীবনের বিভিন্ন ঘটনাবলী তিনি তার জ্ঞান দ্বারা লেখনীতে তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সাবলীল ছন্দে। দর্পণ প্রতিদিনের পাঠকদের কাছে তা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো। আজ তার বিচিত্র জীবনের সচিত্র প্রতিবেদন পর্ব- ১৪ (”সাপুড়ে”)  প্রকাশ করা হলো।

 – গনেশ চন্দ্র হাওলাদার, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক দর্পণ প্রতিদিন।

                      ”সাপুড়ে”

ছোটবেলায় প্রাথমিকে অধ্যয়নকালে সুকুমার রায়ের একটি কবিতা পড়েছিলাম,

“বাবুরাম সাপুরে, কোথা যাস বাপুরে…..”

এই রম্য কবিতাটি পড়ে তখন খুব আনন্দ উপভোগ করতাম। সাপুড়ের জীবন-জীবিকা অত্যন্ত কঠিন হলেও মানুষকে আনন্দ দিতে তারা গ্রাম-গঞ্জে, হাটে-ঘাটে, শহর-বন্দরে এমনকি নগরে প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াত। ছোটখাটো নৌকার বহর নিয়ে নদীপথে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে তারা কিছুদিন অবস্থান করত। সাপুড়ে পেশায় নিয়োজিত মানুষদের নিজস্ব কর্ম থাকলেও, তাদের ধর্ম কী তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে এই সম্প্রদায়ের নারীদের বলা হয় ‘বেদে’। বেদেরাও একইভাবে তাবিজ-কবজ ও ঝাড়-ফুঁক দিয়ে মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিত। বাতের ব্যথা বা অঙ্গের ব্যথা নাশের জন্য তারা পশুর ছোট শিং দিয়ে একধরনের চিকিৎসায় ব্যবহৃত যন্ত্র তৈরি করত, যার নাম ‘শিঙ্গা’। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই শিঙ্গা দিয়ে শরীরের ভেতরের কালো জাদুর ক্ষতিকারক বস্তু বা তাবিজ-কবজ অদৃশ্য পথে বের করে আনা হতো। রোগীর কাছ থেকে নগদ অর্থ, চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বিনিময়ে তারা পারিশ্রমিক আদান-প্রদান করত।

 

বেদে নারীরা শিশুদের কাপড় মুড়িয়ে পিঠে বেঁধে সারা দিন জীবিকার উদ্দেশ্যে পথে হেঁটে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াত এবং বেলা অস্ত যাওয়ার পূর্বে নদীর পাড়ে তাদের বহরে ফিরে আসত। তাদের যে সমস্ত ছেলে-মেয়ে এখনো কর্মের উপযুক্ত হয়নি, তাদেরকে বহরে রেখে যাওয়া হতো। সেই ছেলে-মেয়েরা সারাদিন নৌকায়, নদীর পাড়ে বা বহরের নিকটস্থ এলাকায় ঘুরে বেড়াত ও খেলাধুলা করত। অন্য সাধারণ মানুষের জীবন থেকে এদের জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষার সাথে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। বয়ঃসন্ধিক্ষণে পৌঁছালে তারা বাবা-মায়ের পেশাকেই বেছে নিত এবং তাদের সাথে থেকেই কাজ শিখে নিত। সাপুড়ে বা বেদের দলের একজন দলনেতা থাকেন, যাকে ‘সরদার’ বলা হয়। সরদারের সিদ্ধান্তই তাদের মেনে চলতে হতো। তাদের সকল নিয়ম-কানুন ও রীতিনীতি একান্তই নিজস্ব এবং আদিম গোত্রীয় সংস্কৃতির অনুসারী। সন্তানদের বিয়েশাদিও সাধারণত নিজস্ব গোত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত।

বর্তমান পরিস্থিতি নাগরিক অধিকারের সংকট

বর্তমানে সাপুড়ে বা বেদে সম্প্রদায়ের লোকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তবে মুন্সিগঞ্জ জেলায় এখনো এদের দেখা যায়; যতটুকু মনে পড়ে গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ীতেও এদের মেলা মেলে। ভাসমান এই জনগোষ্ঠী এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় বিধায় তাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। এর ফলে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ এবং অন্যান্য সরকারি ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তবে সাপুড়ে ও বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা এসব নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। তারা নিজেদের কর্মে বিশ্বাসী এবং নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই মিটিয়ে থাকে। পরনির্ভরশীলতা তারা পছন্দ করে না; বরং প্রাকৃতিক উৎস ও উপাদানের ওপর বিশ্বাসী আদিম যুগের মানুষের মতো তারা যাযাবর জীবনযাপনে অভ্যস্ত। আধুনিক মানুষের জীবনযাত্রা থেকে তাদের জীবন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা।

 সংস্কৃতিতে অবদান বনাম বাস্তবতার অবহেলা

আধুনিক যুগের মানুষ সাপুড়ে ও বেদে সম্প্রদায়ের জীবনকাহিনি নিয়ে অনেক নাটক, চলচ্চিত্র ও সাময়িকী তৈরি করে দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যেমন- নব্বইয়ের দশকে নির্মিত ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ চলচ্চিত্রটি একটি দর্শকনন্দিত ও ব্যাপকভাবে ব্যবসাসফল ছবি। এছাড়া এপার বাংলা ও ওপার বাংলায় নাগ-নাগিনীর বিভিন্ন নামে অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ছোটবেলায় আশির দশকে আব্দুল আলী গায়েন বা আব্দুল আলী গারোয়ালীর গান শুনেছি, যা সাপুড়েদের সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত। আবার ময়মনসিংহ গীতিকায় ‘বেহুলা-লক্ষীন্দরের বাসর ঘরে সাপে কাটার’ কাহিনি চিত্রায়িত হয়েছে। অসংখ্য কেচ্ছা-কাহিনি দিয়ে রচিত এই জনগোষ্ঠীর জীবনচিত্র ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

কিন্তু প্রকৃত পক্ষে, সমাজে সাপুড়ে বা বেদে সম্প্রদায়কে সবসময় ছোট করে দেখা হয়েছে; তাদের কোনো সামাজিক মর্যাদা দেওয়া হয়নি। সাপে কাটার মতো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে জীবন বাঁচাতে একসময় প্রয়োজন হতো এই সাপুড়ে, ওঝা, বৈদ্য বা বেদে সম্প্রদায়ের লোকদেরই। আধুনিক চিকিৎসাব্যাবস্থা গড়ে ওঠার পূর্বে, হাজার হাজার বছর ধরে ঝাড়-ফুঁক এবং ওঝা-বৈদ্যদের দাওয়াই (তাবিজ-কবজ) দিয়েই গ্রামীণ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো। তখনকার সময়ে সমাজে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও তারা ছিল অবহেলিত, নিগৃহীত এবং অনেক বাঁধাধরা নিয়মের বেড়াজালে বন্দি।

আধুনিক যুগেও এর কোনো ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় না। যদিও বর্তমান যুগে সাপুড়ে বা বেদে সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী অতি ক্ষুদ্র, তবুও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তারা আজও বিদ্যমান আছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষের কাছে আজও সাপুড়ে বা বেদে সম্প্রদায়ের সেবার চাহিদা ও একধরনের সম্মান বিদ্যমান।

শেষ কথা মানবিক আকুতি

পরিশেষে বলতে চাই, সবাই যদি একই স্রষ্টার সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে মানুষে মানুষে এত বৈষম্য কেন? একই স্রষ্টার দুনিয়ায়, একই আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা ও বেঁচে থাকা মানুষের মধ্যে এই শ্রেণীবিদ্বেষ মোটেই কাম্য নয়। মানুষ নিজেই এই দুনিয়ায় হিংসা, বিদ্বেষ, ছোট-বড়, বংশমর্যাদা এবং গোত্র-সম্প্রদায়ের নামে বিভিন্ন বিভেদ ও শ্রেণী বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। মানুষের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ থাকা বাঞ্ছনীয় এবং তা সর্বজনীন হওয়া উচিত। সমাজে আদৌ তা কখনো পুরোপুরি সম্ভব হবে কি না জানি না, তবে আমার মনের গভীর আকুতিটুকুই ব্যক্ত করলাম আজকের লেখায়।