গ্রেফতারকৃত অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল কে এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী

২০০৭ সালে এক-এগারোর সাবেক সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত সেনা কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত তিন তারকা জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গভীর রাতের এক অভিযানে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

ডিএমপির পল্টন থানায় হওয়া মানবপাচার মামলায় মঙ্গলবার পাঁচ দিনের রিমান্ড পাঠিয়েছে আদালত। ডিবি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারার একটি এলাকা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলার তথ্য আমরা এখন পর্যন্ত পেয়েছি। এর মধ্যে ফেনী জেলায় তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সেসব মামলায় তিনি পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। ফেনী জেলায় আরো তিনটি মামলা এবং ডিএমপিতে পাঁচটি মামলাসহ মোট ৮টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে দুদক এবং সিআইডিতে একাধিক অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।

২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মাসুদ এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেনেন্ট জেনারেল হন। সে সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন তিনি।

ওই কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হত।

সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়া হত।

তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি কার্যত ‘গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান ছিলেন। এই কমিটির মাধ্যমে যৌথবাহিনী পরিচালিত দেশের শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং দুর্নীতির মামলায় জড়ানোর প্রক্রিয়া চালানো হয়।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং একইসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ ছেড়ে দেন তিনি। বাতিল করা হয় ২২ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন।

আলোচিত সেই ঘটনাপ্রবাহের শুরুর দিনটি পরিচিতি পায় ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে।

এক-এগারো পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল তথাকথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’। যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনীতি থেকে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

সেই সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা এবং বিএনপি নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। বিশেষ করে গোয়েন্দা হেফাজতে নিয়ে তারেক রহমানের ওপর অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ আজও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। যেখানে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মুখ্য ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ১৯৭৫ সালের ১ মে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি যখন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয় তখন তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের প্রধান (জিওসি) ছিলেন।

একই বছর তিনি মেজর জেনারেল থেকে পদোন্নতি পেয়ে লেফট্যানেন্ট জেনারেল হন। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

কথিত আছে, সে সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তার অধীন সেনা ব্যাটালিয়নের সহযোগিতায় বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। এরপর তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ তার স্মৃতিচারণ নিয়ে লেখা শান্তির স্বপ্নে বইয়ে লিখেছেন, তিন বাহিনীর প্রধান, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের পিএসও এবং ডিজিএফআইয়ের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

এক পর্যায়ে তার সঙ্গে সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিলে ২০০৮ সালের ২ জুন তাকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার থেকে ডিফেন্স সার্ভিসেস কম্যান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে ও ৮ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। এরপর একই বছর ২ সেপ্টেম্বর তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর তিনি হাইকমিশনার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২০১১ সালের ২৯ জুন তার চাকুরীর মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তীকালে একাধিকবার তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবসর গ্রহণ করেন।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীতে। ‘৭৫ এর পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান রক্ষীবাহিনী থেকে অন্যান্যদের সঙ্গে তাকে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করেন। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। রক্ষীবাহিনী থেকে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে একমাত্র তিনি যেতে পেরেছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি নবম ডিভিশনের জিওসি ছিলেন। যা তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

সেনা জীবন শেষে ২০১৮ সালে তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান।

পারিবারিকভাবে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আত্মীয়। তার ছোট ভাই সাঈদ ইস্কান্দারের ভায়রা ভাই। এই সম্পর্কের জেরে তার পদোন্নতি ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।

অবসরের পর তিনি জনশক্তি রফতানি ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় জড়ান। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কারসাজি ও প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ২৫ আগস্ট মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সূত্র: যুগান্তর